অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
সারাদেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গতকাল শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাতে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই মূল্য সমন্বয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়। আজ রোববার (১৯ এপ্রিল) থেকে এই নতুন মূল্য তালিকা সারাদেশে কার্যকর হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের বর্তমান দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কেরোসিনের দাম ১১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৩০ টাকা। অকটেনের দাম ১২০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৪০ টাকায়, যা সব ধরনের জ্বালানির মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। এছাড়া প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ, লিটারপ্রতি ডিজেলে ১৫ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা, পেট্রোলে ১৯ টাকা এবং অকটেনে ২০ টাকা দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর আগে গত ৩১ মার্চ জারিকৃত এক অফিস আদেশে এপ্রিল মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। সেই সময় প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিন যথাক্রমে ১০০ ও ১১২ টাকা এবং পেট্রোল ও অকটেন ১১৬ ও ১২০ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত বহাল ছিল। তবে মাত্র ১৯ দিনের ব্যবধানে বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের যুক্তিতে এই বড় অংকের মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিল সরকার।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর ভর্তুকির চাপ কমাতে এই মূল্য সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমিয়ে আনা এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে মূল্যের ভারসাম্য রক্ষা করাও এই সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ। স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলা বা ‘প্রাইসিং মেকানিজম’ অনুযায়ী প্রতি মাসে জ্বালানির দাম নির্ধারণের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এটি তারই অংশ।
এদিকে, সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি। শনিবার রাতে এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণ করায় বাজারে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট বা মজুত করার প্রবণতা হ্রাস পাবে। তারা মনে করেন, সময়োপযোগী এই সিদ্ধান্তের ফলে তেল বিক্রিতে স্বচ্ছতা বজায় থাকবে এবং পাম্প মালিকদের বিনিয়োগ ঝুঁকি কমবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। ট্রাক ও লরি ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করবে। এছাড়া সেচ কাজে ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষি খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির অজুহাতে বাস ও পণ্যবাহী যানের ভাড়ায় নৈরাজ্য তৈরি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহনের নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর করতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকার মূলত দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ নিলেও স্বল্পমেয়াদে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের হিমশিম খাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।