শিক্ষা ডেস্ক
এসএসসি ও এইচএসসির মতো জাতীয় পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে পরীক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে এবং পরীক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব করতে ঐতিহাসিক ‘নীরব বহিষ্কার’ প্রথা বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শনিবার (১৮ এপ্রিল) সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় এই সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সভায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা সরাসরি এবং ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন।
সভায় শিক্ষামন্ত্রী জানান, পাবলিক পরীক্ষায় প্রচলিত বিধিতে পরীক্ষার্থীদের জন্য অবমাননাকর বা অযৌক্তিক কোনো ধারা থাকতে পারে না। ১৯৮০ সালের ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন’-এ নীরব বহিষ্কারের কোনো বিধান নেই। মূলত ১৯৬১ সালের বোর্ড নীতিমালায় এই নিয়মটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যা দীর্ঘ সময় ধরে প্রচলিত ছিল। মন্ত্রীর মতে, বর্তমান ডিজিটাল ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে পরীক্ষা কেন্দ্রে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরির সুযোগ নেই। তাই এই পুরনো ও বিতর্কিত নীতিমালা বর্তমানে অকার্যকর এবং অপ্রাসঙ্গিক। তিনি অবিলম্বে এই নীতিমালা পরিবর্তনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ প্রদান করেন।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, “পরীক্ষার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে পরীক্ষা দেবে। তাদের ওপর এমন কোনো বিধিনিষেধ বা পদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়া যাবে না যা দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে হলে পরীক্ষার্থীদের মানবিক মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরপরই ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার স্বাক্ষরিত একটি জরুরি নির্দেশনা দেশের সকল কেন্দ্র সচিবদের কাছে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনায় জানানো হয়েছে, ‘মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষা পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালা ২০২৬’-এর ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদটি সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। এই নির্দেশনা জারির তারিখ থেকেই কার্যকর হবে।
বাতিলকৃত ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা ছিল—যদি কোনো পরীক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে বহিষ্কার করলে কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবেই ‘নীরব বহিষ্কার’ করা যেত। এই প্রক্রিয়ায় পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষার সময় কিছু না জানিয়ে তার উত্তরপত্রের ওপর একটি বিশেষ গোপন প্রতিবেদন যুক্ত করে আলাদা প্যাকেটে শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো হতো। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর জানতে পারত যে তারা বহিষ্কৃত হয়েছে, যা তাদের মাঝে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করত।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ব্যবস্থার ফলে অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থাকত এবং স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠত। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী জানতেই পারত না তার কোন ভুলের জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে এই নিয়মের অপপ্রয়োগের আশঙ্কা থাকত। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হলে তা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রকাশ্যে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে নিতে হবে।
এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অভিভাবক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এটি বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর ফলে পরীক্ষা কেন্দ্রে পরীক্ষক ও পরীক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক ভীতি দূর হবে এবং পরীক্ষার সামগ্রিক মান উন্নত হবে। একই সঙ্গে এটি শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের যে অঙ্গীকার সরকার করেছে, এই পদক্ষেপ তারই একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।