বাংলাদেশ ডেস্ক
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৫তম দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা তার নির্বাচনী এলাকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সকালে সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অব্যবস্থাপনা, তীব্র জনবল সংকট এবং অবকাঠামোগত দুর্দশার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে হাসপাতালটিকে একটি ‘রোগীর’ সঙ্গে তুলনা করেন। চিকিৎসক ও নার্সসহ বিপুল সংখ্যক পদ শূন্য থাকা এবং নতুন ভবন নির্মাণের কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবা কীভাবে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে, তা তিনি সংসদকে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন।
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের স্বাস্থ্যসেবার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো। প্রান্তিক মানুষের প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই হাসপাতালগুলো প্রতিষ্ঠা করা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো নানা সংকটে ধুঁকছে। সংসদ অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে রুমিন ফারহানা জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের বিপুল জনবসতির জন্য একমাত্র সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র এই হাসপাতালটি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই উপজেলার প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবা নির্ভর করে মাত্র ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির ওপর। জনসংখ্যার তুলনায় শয্যা সংখ্যা এমনিতেই অত্যন্ত অপ্রতুল, তার ওপর হাসপাতালটি নিজেই নানাবিধ সংকটে জর্জরিত। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন।
হাসপাতালটির দৈনন্দিন চিকিৎসা কার্যক্রমের বেহাল দশার প্রধান কারণ হিসেবে তীব্র জনবল সংকটের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন এই আইনপ্রণেতা। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে হাসপাতালটিতে চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ কনসালটেন্ট, নার্স এবং অন্যান্য চিকিৎসা সহকারীসহ মোট ৬৪টি পদ শূন্য রয়েছে। গ্রামীণ হাসপাতালগুলোতে সাধারণত গাইনি, অ্যানেসথেসিয়া, মেডিসিন ও শিশু বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি হলেও সরাইল হাসপাতালে এই পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকা পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসকের অভাবে বহির্বিভাগ এবং অন্তর্বিভাগে রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া চাহিদানুযায়ী পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ না থাকা এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে সাধারণ রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। এর প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। বাধ্য হয়ে এসব মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদর হাসপাতাল অথবা রাজধানী ঢাকায় ছুটতে হচ্ছে, যা তাদের জন্য চরম আর্থিক ও শারীরিক ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন।
জনবল ও সরঞ্জামের পাশাপাশি হাসপাতালটির অবকাঠামোগত সংকটের বিষয়টিও সংসদে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়। সংসদ সদস্য জানান, সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মান বৃদ্ধি এবং ধারণক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে তা সম্পূর্ণ থমকে গেছে। বিশেষ করে গত ৫ আগস্টের পর প্রকল্পটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার নির্মাণকাজ ফেলে পালিয়ে যাওয়ায় পুরো প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে ঠিকাদারদের এ ধরনের অনুপস্থিতি এবং রাজনৈতিক পালাবদলের কারণে জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতার একটি বড় উদাহরণ। এর ফলে ব্যাহত হচ্ছে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং বিঘ্নিত হচ্ছে জনসেবা।
নতুন ভবনের কাজ বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে পুরনো ও জরাজীর্ণ একটি দোতলা ভবনে দৈনন্দিন চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। পুরনো ভবনটির বেহাল দশার বর্ণনা দিতে গিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, ভবনটির বাইরের এবং ভেতরের অবস্থা এতটাই নাজুক যে, এটিকে দেখলে নিজেই রোগাক্রান্ত বলে মনে হয়। জরাজীর্ণ, স্যাঁতসেঁতে ও ফাটল ধরা ভবনে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা একদিকে যেমন রোগীদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে চিকিৎসকদের জন্যও তা স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নয়। স্থান সংকুলান না হওয়ায় রোগীদের গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে এবং ব্যাহত হচ্ছে হাসপাতালের স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও এক্ষেত্রে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সংসদে দেওয়া এই বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শূন্য পদগুলোতে চিকিৎসক, কনসালটেন্ট ও নার্স নিয়োগ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে, আটকে থাকা নতুন ভবনের নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে দ্রুত নতুন ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে ভবনের কাজ শেষ করা না হলে বৃহত্তর সরাইল উপজেলার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।