আইন আদালত ডেস্ক
বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়ে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ সচেষ্ট রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে তিনি এ কথা জানান। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, এসব মামলা প্রত্যাহারের জন্য ইতোমধ্যে জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কমিটি গঠনসহ কার্যকর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য মো. মনোয়ার হোসেনের উত্থাপিত একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের লিখিত জবাবে আইনমন্ত্রী এই তথ্য জাতীয় সংসদকে অবহিত করেন। এ সময় সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। আইনমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলকে ইঙ্গিত করে বলেন, সে সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের উদ্দেশ্যে যেসব হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছিল, সেগুলো থেকে ভুক্তভোগীদের আইনি প্রতিকার দিতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলাগুলো চিহ্নিত ও প্রত্যাহারের সুপারিশ করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার গত ৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে জেলা পর্যায়ে একটি কমিটি গঠন করেছে। জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সমন্বয়ে গঠিত চার সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি প্রাথমিক পর্যায়ে আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করবে। পরবর্তীতে জেলা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে একটি ‘কেন্দ্রীয় কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। ছয় সদস্যবিশিষ্ট এই কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন স্বয়ং আইনমন্ত্রী। বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটি জেলা পর্যায় থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলো নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মামলা প্রত্যাহারের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় সংসদকে আরও জানান, সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক—যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে। এমনকি এসব মামলার মধ্যে যদি কোনো হত্যা মামলাও অন্তর্ভুক্ত থাকে, তবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় আবেদন করা হলে গঠিত জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটি তা গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় যদি কোনো মামলা প্রাথমিকভাবে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বলে প্রতীয়মান হয়, তবে আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, এর আগে দায়িত্ব পালন করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের লক্ষ্যে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছিল। তবে ওই কমিটির নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে সে সময় কোনো হত্যা মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়নি। ফলশ্রুতিতে অনেক ভুক্তভোগী দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতার মধ্যে ছিলেন। বর্তমান সরকার সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে হত্যা মামলাসহ সকল ধরনের হয়রানিমূলক মামলা পর্যালোচনার আওতায় নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার পালাবদলের পর পূর্ববর্তী সরকারের আমলের মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি একটি নিয়মিত ঘটনা হলেও, এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপক্ষ যেকোনো সময় আদালতের সম্মতি সাপেক্ষে মামলা প্রত্যাহার করার এখতিয়ার রাখে। তবে রাজনৈতিক মামলার মোড়কে প্রকৃত অপরাধীরা যাতে পার পেয়ে না যায়, সে বিষয়ে গঠিত কমিটিগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন ও সমাবেশের জেরে হাজার হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়েরের রেওয়াজ দেখা গেছে। এসব মামলার কারণে সাধারণ মানুষ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা দীর্ঘমেয়াদি আইনি ও আর্থ-সামাজিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। অনেকে বছরের পর বছর আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন, যা তাদের পারিবারিক ও পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এসব মামলার জট খুলবে এবং বিচার বিভাগের ওপর থেকে মামলার বাড়তি চাপ অনেকাংশে লাঘব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মামলা প্রত্যাহারের এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করা হবে। প্রকৃত ভুক্তভোগীরা যাতে দ্রুত ন্যায়বিচার পান এবং হয়রানি থেকে মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সেটিই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এখন গঠিত জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটিগুলো প্রাপ্ত আবেদনসমূহ কত দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষ করে চূড়ান্ত সুপারিশ প্রদান করে এবং আদালত তা কীভাবে নিষ্পত্তি করেন, সেটিই সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণের বিষয়।