শেয়ার বাজার ডেস্ক
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের শুরুতে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এদিন লেনদেন শুরুর প্রথম ঘণ্টায় অধিকাংশ সিকিউরিটিজের দর বৃদ্ধির পাশাপাশি এক্সচেঞ্জটির প্রধান তিনটি মূল্যসূচকই ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। প্রথম এক ঘণ্টার লেনদেনে বাজারে মোট ২৬২ কোটি ৭০ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা বাজারের সার্বিক তারল্য প্রবাহের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষণে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ডিএসইতে নিয়মিত লেনদেন শুরু হওয়ার পর থেকেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়তে থাকে। প্রথম এক ঘণ্টা, অর্থাৎ বেলা ১১টা পর্যন্ত ডিএসইতে মোট ৩৯২টি কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট লেনদেনে অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ২৮৭টি সিকিউরিটিজের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দরপতন হওয়া সিকিউরিটিজের তুলনায় প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেশি। অন্যদিকে, এই সময়ে দরপতন হয়েছে ৫১টি প্রতিষ্ঠানের এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৫৪টি শেয়ার ও ইউনিটের দাম।
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে ডিএসইর মূল্যসূচকগুলোতে। প্রথম ঘণ্টার লেনদেন শেষে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ‘ডিএসইএক্স’ আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৪২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ২৯৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে। প্রধান সূচকের পাশাপাশি অন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকেও ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় ও আর্থিকভাবে সুদৃঢ় ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ‘ডিএসই-৩০’ সূচক ১৬ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া, ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানিগুলোকে নিয়ে গঠিত ‘ডিএসই শরিয়াহ্’ সূচক ১১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৭৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
লেনদেনের প্রথম ঘণ্টার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাজারে কিছুটা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে সূচক স্থির হয়েছে। সকাল ১০টায় লেনদেন শুরুর পর সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কিছু বিনিয়োগকারীর মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতার কারণে বেশ কিছু শেয়ার সাময়িকভাবে দরপতনের তালিকায় চলে যায়। তবে এই নিম্নমুখী প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বেলা ১১টার দিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্রয়চাপ বাড়লে ওইসব সিকিউরিটিজ পুনরায় দাম বৃদ্ধির তালিকায় ফিরে আসে। শেয়ারবাজারের স্বাভাবিক নিয়মে লেনদেনের প্রথম দিকের এই ধরনের অস্থিরতা বা মূল্যসংশোধন একটি নিয়মিত ঘটনা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
লেনদেনের পরিমাণের দিক থেকেও বৃহস্পতিবারের শুরুটা ছিল বেশ গতিশীল। প্রথম এক ঘণ্টায় ডিএসইতে মোট ২৬২ কোটি ৭০ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর আগে, বুধবারের পূর্ণাঙ্গ কার্যদিবসে (মোট চার ঘণ্টার লেনদেন) এক্সচেঞ্জটিতে সর্বমোট ৮৩৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকার সিকিউরিটিজ হাতবদল হয়েছিল। বুধবারের মোট লেনদেনের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার প্রথম ঘণ্টার লেনদেনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে দিনশেষে মোট লেনদেনের পরিমাণ সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারে টাকার এই প্রবাহ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির একটি অন্যতম নির্দেশক হিসেবে কাজ করে।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে শেয়ারবাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা বিনিয়োগকারীদের বাজারের প্রতি আস্থার প্রতিফলন। সাধারণত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বিক্রি করে নগদ অর্থ তুলে নেওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তবে বৃহস্পতিবারের লেনদেনের প্রাথমিক চিত্রে এর বিপরীত অবস্থা দেখা গেছে, যেখানে বিক্রির চেয়ে শেয়ার কেনার প্রতিই বিনিয়োগকারীদের বেশি আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে, প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৩০০ পয়েন্টের মনস্তাত্ত্বিক সীমার কাছাকাছি অবস্থান করায় বাজারে একটি নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ এবং বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করার উদ্যোগের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেছে। পাশাপাশি, মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ার ও ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় সূচকে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তবে বিশ্লেষকরা বিনিয়োগকারীদের সবসময়ই কোম্পানির সার্বিক আর্থিক অবস্থা, লভ্যাংশ প্রদানের ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। দিনশেষে এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা কতটা টেকসই হয়, তা মূলত নির্ভর করবে লেনদেনের পরবর্তী সময়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির ওপর।