আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের অচল কূটনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে প্রায় ৩৪ বছর পর সরাসরি আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ইসরায়েল ও লেবানন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক ঘোষণায় জানানো হয়েছে, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে এই আলোচনা আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলমান বৈরিতা ও সীমান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগকে আঞ্চলিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্প বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে কিছুটা স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর দুই দেশের নেতৃত্ব পর্যায়ের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে, যা ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। তবে আলোচনা কোথায় বা কোন কাঠামোর অধীনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
এর আগে চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটন ডিসিতে ইসরায়েল ও লেবাননের প্রতিনিধিদের মধ্যে কয়েক দশক পর প্রথমবারের মতো সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে জানানো হয়। ওই বৈঠককে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা পরোক্ষ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে সরাসরি সংলাপে উত্তরণের একটি প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে একই সময়ে সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনী ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে, যা পুরো পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে শত্রুতাপূর্ণ। বিশেষ করে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনার কারণে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯১ সালের মাদ্রিদ শান্তি সম্মেলনকে সর্বশেষ বড় কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে আঞ্চলিক শান্তি কাঠামোর অংশ হিসেবে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত কিছু সীমিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হলেও তা স্থায়ী কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো এবং হিজবুল্লাহর প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে। পাশাপাশি লেবাননের প্রচলিত আইনি কাঠামোতে ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্য সংলাপ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
এতদিন দুই দেশের মধ্যে যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তি বা বার্তা আদান–প্রদান মূলত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী (ইউনিফিল) কিংবা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে সম্পন্ন হতো। ফলে বর্তমান সরাসরি আলোচনা উদ্যোগকে বিদ্যমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, চলমান সীমান্ত সংঘাত এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এই আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। বিশেষ করে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে আলোচনা প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই সংলাপ ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়া যায় এবং পারস্পরিক আস্থা গড়ে ওঠে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রশমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।