আন্তর্জাতিক ডেস্ক
এক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কক্ষপথে অবস্থানরত একটি চীনা নির্মিত স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনার ওপর নজরদারি চালাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর গোপন একটি চুক্তির মাধ্যমে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) চীনা একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ‘টিইই-০১বি’ নামের একটি উন্নত স্যাটেলাইট অধিগ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে কৌশলগত গোয়েন্দা কার্যক্রমে ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চীনের ‘আর্থ আই কোম্পানি’ নামের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্যাটেলাইটটি নির্মাণ ও কক্ষপথে স্থাপন করে। প্রতিষ্ঠানটি ‘ইন-অরবিট ডেলিভারি’ নামে পরিচিত একটি বাণিজ্যিক মডেলে কাজ করে, যেখানে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর সেটির নিয়ন্ত্রণ নির্দিষ্ট গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই ব্যবস্থার আওতায় ইরান স্যাটেলাইটটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে বলে দাবি করা হয়েছে।
আরও বলা হয়, স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম পরিচালনায় বেইজিংভিত্তিক আরেকটি সেবা প্রদানকারী সংস্থার গ্রাউন্ড স্টেশন নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে আইআরজিসি। এই প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর মাধ্যমে ইরান এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা অর্জন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি সময়ে স্যাটেলাইটটি সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসের ওপর দিয়ে একাধিকবার অতিক্রম করে উচ্চ রেজল্যুশনের ছবি সংগ্রহ করে। ওই সময় ঘাঁটিটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও কার্যক্রম সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় ছিল। একই সময়ে জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি এয়ার বেস, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এবং ইরাকের এরবিল বিমানবন্দর এলাকাও পর্যবেক্ষণের আওতায় ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া কুয়েত, জিবুতি ও ওমানের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত মার্কিন সংশ্লিষ্ট সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপরও স্যাটেলাইটটির নজরদারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শুধু সামরিক স্থাপনাই নয়, বাহরাইনের একটি শিল্প কারখানা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোও পর্যবেক্ষণের আওতায় ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, এ ধরনের উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও এর নিয়ন্ত্রণ কোনো দেশের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। সাধারণত এ ধরনের প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কঠোর সরকারি অনুমোদন ও আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ অনুসরণ করা হয়। ফলে কোনো চীনা কোম্পানি এককভাবে এ ধরনের প্রযুক্তি সরবরাহ করতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মতামত উল্লেখ করা হয়েছে।
পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি অংশের ধারণা, চীন সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িত না হলেও প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সহায়তার মাধ্যমে ইরানের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পরোক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই ধরনের সহযোগিতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে পূর্বের মতোই অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। তাদের অবস্থান অনুযায়ী, চীন কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে এমন প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে না।
এছাড়া অতীতে রাশিয়ার কাছ থেকেও ইরান অনুরূপ স্যাটেলাইট প্রযুক্তি সহায়তা পেয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল—এমন প্রসঙ্গও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যা ইরানের মহাকাশ ও গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক মহাশক্তিগুলোর মধ্যকার প্রযুক্তি ও কৌশলগত প্রতিযোগিতাও আরও তীব্র হতে পারে বলে তারা ধারণা প্রকাশ করেছেন।