বাংলাদেশ ডেস্ক
উপজেলা পর্যায়ের ভূমি অফিসে বিদ্যমান অনিয়ম ও দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে সরকার বিভিন্ন প্রশাসনিক ও ডিজিটাল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন ভূমি মন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে রংপুর-৪ আসনের এনসিপি দলীয় সদস্য আখতার হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন।
মন্ত্রী জানান, ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দালালচক্রের প্রভাব কমাতে ভূমি মন্ত্রণালয় একাধিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু ও সম্প্রসারণ করেছে। এর মধ্যে ই-নামজারি বাধ্যতামূলক করা অন্যতম প্রধান উদ্যোগ। তিনি বলেন, এখন থেকে নাগরিকদের সব ধরনের নামজারি আবেদন অনলাইনের মাধ্যমে করতে হবে এবং আবেদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে—নোটিশ জারি, শুনানি ও অনুমোদনসহ—এসএমএসের মাধ্যমে আবেদনকারীকে তথ্য জানানো হচ্ছে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে এবং সেবা প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হবে।
তিনি আরও জানান, ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নগদ লেনদেনের সুযোগ সীমিত করতে অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর (Land Development Tax) ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নাগরিকরা নিজেদের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি সরকারি কোষাগারে কর পরিশোধ করতে পারছেন। এতে নগদ অর্থ লেনদেনের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে বলে মন্ত্রণালয় দাবি করছে।
ভূমি মন্ত্রী বলেন, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে আকস্মিক পরিদর্শন চালু রয়েছে। দায়িত্ব অবহেলা বা অনুপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শোকজ এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ভূমি অফিসে ঘুষ দাবি বা দালাল চক্রের হয়রানির অভিযোগ জানানোর জন্য ১৬১২২ নম্বরের একটি জাতীয় হটলাইন চালু রয়েছে। এটি ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে এবং প্রাপ্ত অভিযোগ সরাসরি মন্ত্রণালয় পর্যায়ে তদারকি করা হয়। পাশাপাশি এ হটলাইনের মাধ্যমে ভূমিসেবা সংক্রান্ত পরামর্শও প্রদান করা হচ্ছে।
ভূমি রেকর্ড ও নকশা জালিয়াতি প্রতিরোধে ডিজিটাল সার্ভে কার্যক্রম চালু করা হয়েছে বলেও মন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্ভুল মানচিত্র তৈরির পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এতে ভূমি জরিপে মানবিক ত্রুটি ও অনিয়মের সুযোগ কমে আসবে এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে ডিজিটাল জরিপ সম্প্রসারণ করা হবে।
নাগরিক সেবার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ঢাকার তেজগাঁও নাগরিক সেবা কেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে সরাসরি ভূমিসেবা গ্রহণ করা যাচ্ছে। এছাড়া land.gov.bd পোর্টালের মাধ্যমে ঘরে বসেই যেকোনো মৌজার খতিয়ান দেখা এবং নির্ধারিত ফি প্রদান সাপেক্ষে পর্চা ডাকযোগে সংগ্রহ করার সুবিধা রয়েছে। এতে দালালের উপর নির্ভরতা ও অতিরিক্ত ব্যয় কমছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী আরও জানান, ভূমিসেবা আরও সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ভূমিসেবা মোবাইল অ্যাপ, অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা সিস্টেম, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার, লিজ ও সেটেলমেন্ট সিস্টেমসহ একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ভূমি প্রশাসনে জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি হ্রাস এবং সেবার গতি বাড়বে বলে মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করেছে।
জাতীয় সংসদে দেওয়া এই বক্তব্যে ভূমি মন্ত্রণালয়ের চলমান ডিজিটাল রূপান্তর কার্যক্রমকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নাগরিক সেবা উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে তুলে ধরা হয়।