অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশের ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত কর বা আর্থিক চাপ আরোপ করা হবে না বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে করের আওতা সম্প্রসারণের ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে, তবে ব্যক্তিশ্রেণির করহার বৃদ্ধি করা হবে না। বরং করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সোমবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা ২০২৬–২০২৭: বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অর্থ মন্ত্রণালয় কর প্রশাসন ও রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, তার ইতিবাচক প্রভাব আগামী বাজেট এবং পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে দেখা যাবে। তিনি উল্লেখ করেন, করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব ভিত্তি সম্প্রসারণ করা সরকারের প্রধান লক্ষ্য, যাতে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হয়।
তিনি আরও বলেন, বাজেটে ব্যবসায়ীদের জন্য কোনো ধরনের “কঠোর ব্যবস্থা” নেওয়া হচ্ছে—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। বরং ব্যবসা-বাণিজ্যবান্ধব পরিবেশ বজায় রেখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল রাখার বিষয়টি সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আলোচনায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে সরকারের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি জানান, সরকারকে এখন আগের তুলনায় উচ্চমূল্যে জ্বালানি ও সার আমদানি করতে হচ্ছে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) চুক্তির আওতায় যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আগে স্পট মার্কেটে প্রায় ১০ ডলারে আমদানি করা হতো, বর্তমানে তা প্রায় ২০ ডলারে কিনতে হচ্ছে। একইভাবে, যে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আগে ৫০ থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে আমদানি করা হতো, বর্তমানে তার মূল্য ১১৬ ডলারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি, সার আমদানির ক্ষেত্রে পূর্বের তুলনায় ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশের জ্বালানি অবকাঠামোতে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় স্বল্পমেয়াদি মূল্য ওঠানামার প্রভাব সরাসরি অর্থনীতিতে পড়ছে। তিনি বলেন, যদি দেশের হাতে দুই মাসের মতো এলএনজি মজুদ রাখার সক্ষমতা থাকত, তাহলে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটের উচ্চ দামে জ্বালানি কেনার প্রয়োজন হতো না।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ আমদানিনির্ভর দেশ তাদের জ্বালানি ও কৌশলগত পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট রিজার্ভ বা মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ ব্যবস্থা এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। ভবিষ্যতে এ খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনা নয়, বরং ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশকে সহজ ও কার্যকর করা। আমদানি প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম সহজীকরণের ওপর সরকার কাজ করছে, যাতে বেসরকারি খাত আরও গতিশীল ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা আসন্ন বাজেটে কর নীতি, আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়ে তাদের প্রত্যাশা তুলে ধরেন। তারা জানান, বৈশ্বিক মূল্য অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
আলোচনার শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নীতি প্রণয়ন অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বাস দেন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সরকার-বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।