অর্থনীতি প্রতিবেদক
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেল এবং সার খাতে চাপ মোকাবিলায় সরকারি ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন খাতে পরিচালন ব্যয় হ্রাসের নির্দেশনা জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গত ৯ এপ্রিল জারি করা এক পরিপত্রে সরকারি গাড়ির জ্বালানি ব্যবহার, বিদেশি প্রশিক্ষণ, সভা-সেমিনার, ভ্রমণসহ একাধিক খাতে ব্যয় কমানোর বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, সরকারের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে পরিচালন ব্যয় হ্রাসকল্পে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে। এর আওতায় সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে।
গত ২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিদ্যমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে প্রভাব পর্যালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে অর্থ বিভাগের প্রণীত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা এবং অর্থায়ন কৌশল বিবেচনা করে ব্যয় সাশ্রয়ের একাধিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ওই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ পরিপত্রটি জারি করা হয়।
পরিপত্র অনুযায়ী সরকারি পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে সরকারি গাড়িতে মাসিক ভিত্তিতে বরাদ্দকৃত জ্বালানির ব্যবহার ৩০ শতাংশ হ্রাস করা। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি ক্রয়ের জন্য সুদমুক্ত ঋণ প্রদান কার্যক্রম এবং সরকারি অর্থায়নে সব ধরনের বৈদেশিক প্রশিক্ষণ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।
অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও ব্যয় সংকোচন আনা হয়েছে। প্রশিক্ষণ ব্যয় ব্যতীত অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ব্যয় ৫০ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সভা ও সেমিনারে আপ্যায়ন ব্যয় ৫০ শতাংশ এবং সেমিনার ও কনফারেন্স ব্যয় ২০ শতাংশ কমানোর কথা বলা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের ভ্রমণ ব্যয়ও ৩০ শতাংশ হ্রাস করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি খাতে গাড়ি, জলযান, আকাশযান এবং কম্পিউটার ক্রয় শতভাগ বন্ধ থাকবে বলে পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে নতুন মূলধনি ক্রয় কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ কার্যকর হলো।
এছাড়া সরকারি কার্যালয়ে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে ৩০ শতাংশ সাশ্রয় নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবাসিক ভবনের শোভাবর্ধন ব্যয় ২০ শতাংশ এবং অনাবাসিক ভবনের শোভাবর্ধন ব্যয় ৫০ শতাংশ হ্রাস করা হবে। পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় শতভাগ কমানোর নির্দেশও পরিপত্রে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পরিপত্রটি অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে সব সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার পরিচালন ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে সরকারি খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উদ্যোগ হিসেবে এই পদক্ষেপকে দেখা হচ্ছে।
তবে প্রশাসনিক কার্যক্রমে কিছু ক্ষেত্রে স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রশাসন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে এ সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকারের এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আপাতত রাষ্ট্রীয় ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর হলো, যা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে।