আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন বিশ্ব অর্থনীতিকে বহুমুখী সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ইরান সংশ্লিষ্ট উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ফলে তেল ও গ্যাস পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে, যা সরাসরি খাদ্য উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে।
ইউএনডিপির প্রশাসক ও বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডি ক্রু বলেন, চলমান এই সংঘাত বৈশ্বিক উন্নয়নের গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং দীর্ঘদিনের অর্জনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তার মতে, দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের পথে থাকা জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ মূল্যস্ফীতি ও আয় হ্রাস তাদের পুনরায় দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত কয়েক সপ্তাহে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সার উৎপাদন খাতে পড়েছে, যার ফলে কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিপিং খরচ বৃদ্ধির কারণে খাদ্যপণ্য আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা একে সম্ভাব্য ‘খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, দৈনিক ৮ দশমিক ৩০ ডলারের নিচে আয়কারী ব্যক্তিদের দারিদ্র্যসীমার নিচে গণ্য করা হয়। এই মানদণ্ড ব্যবহার করে ইউএনডিপি তাদের পূর্বাভাসে জানিয়েছে, যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে ৩ কোটি ২৫ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়বে। বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়ার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ এবং ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রতিবেদনে মোট ৩৭টি জ্বালানি আমদানিকারক দেশের ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সংকট মোকাবেলায় ইউএনডিপি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। সংস্থাটি অন্তত ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নগদ সহায়তা প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে, যা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যূনতম জীবনযাত্রা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে একই সময়ে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, উন্নত দেশগুলো তাদের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করায় উন্নয়ন সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। ২০২৫ সালে এই সহায়তা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কমে ১৭৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন আরও সংকুচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে এবং সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ও মানবিক চাপ বাড়াতে পারে।
ইউএনডিপি মনে করে, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু অভিযোজন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো না হলে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়বে। সংস্থাটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য তাৎক্ষণিক সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।