অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৩৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত ‘ব্যালান্স অব পেমেন্টস ম্যানুয়াল-৬ (বিপিএম-৬)’ পদ্ধতি অনুসারে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভের এই পার্থক্য মূলত হিসাব পদ্ধতির ভিন্নতার কারণে সৃষ্টি হয়। প্রচলিত মোট রিজার্ভের পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে কেবলমাত্র তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা সম্পদের হিসাব তুলে ধরা হয়। ফলে এই পদ্ধতিতে প্রকাশিত রিজার্ভ আন্তর্জাতিকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বর্তমান অবস্থান নির্ধারণে তিনটি প্রধান উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে—রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) প্রবাহ এবং আমদানি ব্যয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, যা রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হয়েছে। বিশেষ করে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত শক্তিশালী হয়েছে।
অন্যদিকে, আমদানি ব্যয়ের ওপরও রিজার্ভের চাপ নির্ভর করে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য এবং শিল্প কাঁচামালের দাম ওঠানামা করায় আমদানি ব্যয়ের পরিমাণে পরিবর্তন আসে। এসব খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেলে রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। তবে নিয়ন্ত্রিত আমদানি নীতি এবং বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান রিজার্ভ দেশের বৈদেশিক লেনদেন সক্ষমতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে জরুরি পণ্য আমদানি, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে এই রিজার্ভ একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের রিজার্ভ অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। বর্তমান রিজার্ভ সেই সক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রিজার্ভের পরিমাণ শুধু মোট অঙ্কে নয়, এর গুণগত দিকও গুরুত্বপূর্ণ। বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে প্রকাশিত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থার প্রতিফলন ঘটায়। এতে বোঝা যায়, দেশের হাতে বাস্তবে কতটুকু বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে যা তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে এই সূচক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এদিকে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহ উৎসাহিত করা এবং আমদানি ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই নীতিনির্ধারকদের নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আর্থিক খাতের সুশাসন জোরদার করাও রিজার্ভ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সার্বিকভাবে, বর্তমান রিজার্ভ পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে রিজার্ভের এই অবস্থান ধরে রাখা এবং ধীরে ধীরে তা শক্তিশালী করা আগামী দিনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।