আন্তর্জাতিক ডেস্ক
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের এই আলটিমেটামের জবাবে তেহরান পাল্টা সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, এমন চাপ প্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অস্থিতিশীল করে তুলবে এবং এর দায়ভার যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।
শনিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ইরানকে পুনরায় ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই পদক্ষেপ না নিলে ইরানের জন্য কঠোর পরিণতি অপেক্ষা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশিত এক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, পূর্বে ইরানকে চুক্তিতে পৌঁছানো অথবা প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ১০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছিল, যা প্রায় শেষের দিকে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাকি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত না এলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।
এদিকে ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক সমন্বয়কারী সংস্থা খাতাম আল-আম্বিয়া যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটির এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘অযৌক্তিক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে উল্লেখ করা হয়। সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আলী আবদুল্লাহি আলীআবাদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এই ধরনের বক্তব্য পরিস্থিতি শান্ত করার পরিবর্তে উত্তেজনা বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের হুমকি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিনীতির পরিপন্থী এবং এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
ইরানি এই কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে যে কোনো সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে। তার মতে, এ ধরনের বক্তব্য ‘আগুনে ঘি ঢালার’ মতো কাজ করছে, যা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কূটনৈতিক সমাধানের পথই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই প্রণালির মাধ্যমে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়। ফলে এ অঞ্চলে যেকোনো উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা বাড়াতে পারে। ইতোমধ্যে এই পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে করে আমদানিনির্ভর দেশগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পর থেকে এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে কৌশলগত অবস্থান কঠোর করে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংকট দ্রুত নিরসন না হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এর প্রভাব পড়বে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন খাত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার ওপর জোর দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মহল। তবে উভয় পক্ষের কঠোর অবস্থান সংকট নিরসনে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের উত্তেজনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।