আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালির উপর তার প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ চাপ সৃষ্টি করছে। পারস্য উপসাগরের প্রধান এই জলপথের মাধ্যমে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ প্রবাহিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ কৌশলগতভাবে পারমাণবিক অস্ত্র রাখার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি তেহরানের সামরিক ও ছায়াশক্তিরা নিয়ন্ত্রণ করছে, যা জাহাজ চলাচলে নিয়মিত টোল বা মাশুল ধার্য করার মাধ্যমে কার্যকর হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট মারওয়ান মুয়াশার বলেন, ‘ইরান আবিষ্কার করেছে যে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পারমাণবিক অস্ত্র রাখার চেয়ে বেশি কার্যকর।’
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে যৌথ কর্মকাণ্ডের পরও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব অটুট রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক প্রচেষ্টার ব্যর্থতার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেহরানকে সতর্ক করে উল্লেখ করেন, প্রণালিটি খুলতে হবে। এর আগের দিনে তিনি ইতিবাচক সুরে আশা প্রকাশ করেছিলেন যে ইরান তাদের তেল রপ্তানি করতে বাধ্য হবে, যা প্রণালির স্বাভাবিক খুলে যাওয়ার পথ তৈরি করবে।
ইরান এ সময় তাদের অবস্থান আনুষ্ঠানিক করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। স্থায়ীভাবে টোল আদায়ের মাধ্যমে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সংশ্লিষ্ট জাহাজের যাতায়াত নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই উদ্যোগকে তারা রাজস্বের উৎস এবং সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে দেখছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, প্রতিটি ট্যাংকার থেকে আদায় হওয়া ২০ লাখ ডলারের টোল ইরানের দৈনিক আয় কোটি কোটি ডলারে পৌঁছাচ্ছে।
সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে ইরান এখন ‘রাজনৈতিক সহনশীলতা ও টিকে থাকার’ নীতি অনুসরণ করছে। কার্নেগির বিশ্লেষক করিম সাজাদপুর বলেন, হরমুজ প্রণালি এখন তাদের নিজস্ব করিডোর হিসেবে কার্যকর হচ্ছে। ফলে ইরান সরাসরি জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব বিস্তার করছে।
এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রামের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। গবেষক নিকোল গ্রাজিউস্কি বলেন, এক বছরের মধ্যে ইরান তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম পুনরায় সজ্জিত করতে সক্ষম হবে, এবং ছোট বা বেসামরিক স্থাপনায় ড্রোন তৈরি করা সহজ।
বিশ্ববাজারে হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীলতা নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে অন্যান্য মুদ্রায় জ্বালানি বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, যা চীনের প্রতি বিশেষ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেত কুপার ৪১টি দেশের বৈঠকে বলেছেন, ইরান আন্তর্জাতিক নৌপথ দখল করে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলেছে।
এ ছাড়া, সৌদি আরব, ইরাক এবং অন্যান্য পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর অধিকাংশ তেল রপ্তানি এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ের অপারেশন এপিক ফিউরি শুরুর পর থেকে ইরান জাহাজে ২৫টিরও বেশি আক্রমণ করেছে এবং প্রায় দুই হাজার জাহাজে ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, আরব বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা এখন প্রায় অকার্যকর। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত করেছে, এবং অন্য কোনো রাষ্ট্র এটি জোরপূর্বক খোলার সক্ষমতা বা সদিচ্ছা রাখে না।
এই প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বিশ্ব অর্থনীতি এবং কৌশলগত সামরিক ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।