আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাকস। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হলে দুবাই ও আবুধাবির মতো বিশ্বমানের শহরগুলো গুরুতর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর ফলে শুধু নিরাপত্তাই নয়, আমিরাতের বৈশ্বিক পর্যটন ও আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা অর্থনৈতিক মডেলও বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
স্যাকস ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত যদি চলমান সংঘাতে যুক্ত হয়, তাহলে দুবাই ও আবুধাবি ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই শহরগুলো দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রতিরক্ষার জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক পর্যটন ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। স্যাকস বলেন, “এগুলো অবকাশযাপন কেন্দ্র ও বিনিয়োগের জায়গা; কোনো দুর্গ বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এলাকা নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা মানেই শহরের মূল উদ্দেশ্য ধ্বংস করা।”
তিনি আরও বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌশলগত অবস্থান একটি ভুল হিসাবের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ফলে দেশটি আঞ্চলিক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। স্যাকসের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে নিজেদের সুরক্ষায় ভুল হিসাব করেছে। তিনি সাবেক মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জারের মন্তব্যের উদাহরণ দিয়ে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হওয়া বিপজ্জনক, কিন্তু বন্ধু হওয়াটাও কখনও কখনও মারাত্মক হতে পারে।”
এ অবস্থায় স্যাকস আমিরাতের নেতৃত্বকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশটির উচিত নিজেদের সুরক্ষিত রাখা এবং চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে একটি ভুল পথে না এগোনো।
এই মন্তব্যের আগে ইরানও আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্ক করেছে। গত ২০ মার্চ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ভূখণ্ডে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে হামলা চালাতে না দেয়। তেহরান এই ঘাঁটিগুলো বর্তমান সংকটের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং ব্যবহার অনুমোদন দিলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে বলে সতর্ক করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৩০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও। জবাবে ইরান ইসরায়েল, জর্ডান, ইরাক ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। এতে প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি, পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজার ও বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো ইতোমধ্যেই তাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইরানি হামলার নিন্দা জানিয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ার সম্ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে, যা সংঘাতের বিস্তার আরও বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য বড় প্রশ্ন হলো, তাদের কৌশলগত জোট বাস্তবে নিরাপত্তা দিচ্ছে কি না, নাকি ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। দুবাই ও আবুধাবির মতো শহরগুলোর জন্য এই প্রশ্ন কেবল ভূরাজনীতির নয়; বরং অর্থনৈতিক ভিত্তি ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।