আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) তাদের নৌবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলিরেজা তাংসিরির মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। সোমবার (৩০ মার্চ) ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের একটি বিমান হামলায় তিনি নিহত হন। ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন ইরান এবং মার্কিন-সমর্থিত ইসরায়েলি জোটের মধ্যে উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আইআরজিসির বিবৃতিতে তাংসিরিকে একজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যিনি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা কৌশল নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার নেতৃত্বে পারস্য উপসাগর ও সংলগ্ন জলসীমায় ইরানের নৌ-তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আলিরেজা তাংসিরির বিরুদ্ধে ২০১৯ ও ২০২৩ সালে পৃথকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, তিনি আইআরজিসি নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং সশস্ত্র ড্রোন উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া তিনি একটি ড্রোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তাংসিরির অধীনে ইরান হরমুজ প্রণালিতে উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করে। এই প্রণালিটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন এই পথ দিয়ে সম্পন্ন হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই জলপথে নৌ-চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাংসিরির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে তাকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইআরজিসি জানিয়েছে, তার অবদান অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে বাহিনী তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আইআরজিসির এই শীর্ষ কমান্ডারের মৃত্যু পারস্য উপসাগর অঞ্চলে ইরানের সামরিক কার্যক্রমে স্বল্পমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সংগঠনটি দ্রুত নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণ করে তাদের নৌ-কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত তাংসিরির উত্তরসূরি হিসেবে কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
এদিকে, এই হামলার ফলে তেহরান ও তেল আবিবের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ইরান ইতোমধ্যে এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শোক পালনের মধ্য দিয়ে নিহত এই কর্মকর্তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে, যেখানে স্থল ও আকাশপথের পাশাপাশি সমুদ্রপথও গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।