অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হঠাৎ হামলার পর ইরানের কৌশলগত হরমুজ প্রণালি অচল হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক কোনো বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি। গত ২৫ দিনে চট্টগ্রাম বন্দরে ৩০টি জাহাজ ভিড়েছে এবং আগামী ৪ এপ্রিলের মধ্যে আরও ছয়টি জাহাজ আসার কথা রয়েছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, মার্চ মাসে ৩ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত বন্দরে ৩০টি জাহাজ এসেছে। এর মধ্যে ২৭টি ইতোমধ্যে খালাস করা হয়েছে এবং দুটি বর্তমানে খালাস প্রক্রিয়াধীন। আগামী ৪ এপ্রিলের মধ্যে আরও ছয়টি জাহাজ বন্দরে আসবে। এ জাহাজগুলির মধ্যে তিনটিতে এলএনজি, দুটিতে গ্যাস অয়েল এবং একটিতে এলপিজি রয়েছে।
তবে দেশের একমাত্র সরকারি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমানে কারখানায় ৪০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল রয়েছে, যা প্রায় ১০-১২ দিন ব্যবহারযোগ্য। দৈনিক সাড়ে চার হাজার টনের সক্ষমতা থাকা কারখানায় বর্তমানে ৩,৮০০ টন করে তেল পরিশোধন হচ্ছে। পরিশোধিত তেল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে। সর্বশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারি এক লাখ টন ক্রুড অয়েল ইআরএলে পৌঁছেছে, যা প্রতিদিন পরিশোধনের মাধ্যমে বিপিসিকে সরবরাহ করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালির অচল হওয়া এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই নৌপথে পরিবহন করা হয়। তবে ইরান ঘোষণা করেছে, নির্দিষ্ট কিছু ‘বন্ধু দেশ’ এবং বিশেষ অনুমোদিত দেশের জাহাজ চলাচল করতে পারবে। এই তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরাক ও পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি।
৩ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত বন্দরে আসা জাহাজের মধ্যে ছয়টিতে এলএনজি এসেছে, যার পাঁচটি কাতার এবং একটি অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছে। এলপিজি নিয়ে এসেছে আটটি জাহাজ, যার মধ্যে তিনটি মালয়েশিয়া, দুটি ওমান, দুটি ভারত এবং একটি সিঙ্গাপুর থেকে এসেছে। বাকি ১৬টি জাহাজের মধ্যে পাঁচটিতে গ্যাস অয়েল, চারটিতে হাই সালফার ফুয়েল এসেছে।
ক্রুড তেল আমদানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশে প্রতি মাসে প্রায় ১ থেকে ১.৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি হয়, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। মার্চ মাসে নির্ধারিত দুটি জাহাজের কোনোটি এখনও দেশে পৌঁছায়নি। সর্বশেষ ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি জাহাজে ক্রুড অয়েল এসেছে। ইআরএলের উপ-মহাব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, “২৮ ফেব্রুয়ারি এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমরা পেয়েছি এবং তা বর্তমানে প্রতিদিন ৩,৮০০-৪,০০০ টন করে পরিশোধন করা হচ্ছে। তবে আমদানির ক্ষেত্রে বর্তমানে সংকট রয়েছে।”
সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে অপেক্ষমাণ এক লাখ টন তেল নিয়ে জাহাজটি হরমুজ প্রণালির অচল অবস্থার কারণে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারছে না। আরও এক লাখ টন তেল ২১ মার্চ দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল, যা বাতিল হয়েছে। ২১ এপ্রিল আরও একটি জাহাজে তেল লোডের শিডিউল রয়েছে, যা নির্ধারিত সময়ে দেশে পৌঁছালে ১ বা ২ মে জাহাজটি দেশে আসবে।
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা ৬৫-৬৮ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত তেল সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা হয়।