আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার কথা বললেও অন্যদিকে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে তেহরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সাম্প্রতিক একাধিক বক্তব্যে এই অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, চলমান পরিস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে জানা গেছে, আরাগচি বলেছেন, স্কুল, হাসপাতাল, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা এবং আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন বেসামরিক কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় দাবি করেন, ইসরায়েল ইরানের দুটি বড় ইস্পাত কারখানা, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একটি বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এসব হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই পরিচালিত হয়েছে বলে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
আরাগচির মতে, এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত কূটনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা ১০ দিনের জন্য স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছিলেন। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে ইরানের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করেছেন। ওই আলোচনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামরিক উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে বলে জানা গেছে।
ইরানি কর্মকর্তারা মনে করছেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ দায়ী। আরাগচি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রণালির নিরাপত্তা ও নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণে ইরানের আইনগত অধিকার রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় সেখানে উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনার আহ্বান জানালেও অন্যদিকে ইরানের বিভিন্ন শিল্প ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোকে তেহরান ‘অসহনীয়’ হিসেবে বিবেচনা করছে। তার মতে, এই দ্বৈত অবস্থান পারস্পরিক আস্থা গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি বা উত্তেজনা হ্রাস উদ্যোগে সাড়া দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে বলে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত নৌপথে অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যাহত হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।