আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সব ধরনের বর্ণবাদ ও জাতিগত বৈষম্য মোকাবিলায় বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। একই সঙ্গে তিনি বর্ণবাদ নির্মূল, সাম্য প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ও কার্যকর উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।
সোমবার (২৩ মার্চ) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘আন্তর্জাতিক বর্ণবাদ নির্মূল দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক স্মারক সভায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। মঙ্গলবার ঢাকায় প্রাপ্ত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। বৈশ্বিক এই দিবসটি প্রতি বছর পালিত হয় বর্ণবাদ, বৈষম্য ও ঘৃণার বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে।
সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বর্ণবাদ ও জাতিগত বৈষম্যবিরোধী আন্তর্জাতিক আইন ও কাঠামোর প্রতি বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্ণবাদবিরোধী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও চুক্তিতে বাংলাদেশ স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে এসব নীতিমালার প্রতি অটল রয়েছে এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী এখনও বিভিন্ন অঞ্চলে বর্ণবাদ ও বৈষম্যের চর্চা অব্যাহত রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও মানবাধিকারের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত। এ প্রেক্ষাপটে তিনি রাখাইন অঞ্চলের পরিস্থিতি এবং গাজায় চলমান নিপীড়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তার মতে, এসব ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, বর্ণবাদ নির্মূলে গৃহীত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার ও ঘোষণাসমূহ বাস্তবায়নে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশেষভাবে ডারবান ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বলেন, বর্ণবাদ, জাতিগত বৈষম্য, বিদেশবিদ্বেষ এবং সংশ্লিষ্ট অসহিষ্ণুতা দূরীকরণে এ ঘোষণার লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। ফলে এ বিষয়ে আরও সমন্বিত ও শক্তিশালী উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাপী অভিবাসী শ্রমিকদের পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে তারা বৈষম্য, শোষণ এবং ন্যায়বিচারে সীমিত প্রবেশাধিকারের সম্মুখীন হন। এসব বাস্তবতা জাতিসংঘের মৌলিক নীতি ও মানবাধিকারের চেতনার পরিপন্থী। তিনি অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, বৈষম্য ও অন্যায় প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক বৈশ্বিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা, সুশীল সমাজ এবং অন্যান্য অংশীজনদের সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতির প্রসঙ্গে ড. খলিলুর রহমান বলেন, দেশের সংবিধানে মানবাধিকার, সমতা ও মর্যাদা রক্ষার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে।
তিনি বর্ণবাদমুক্ত বিশ্ব গঠনে শিক্ষার ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তোলা সম্ভব। পাশাপাশি, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ঘৃণামূলক প্রচারণা প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি পেলে বৈষম্য ও বিভাজন হ্রাস পাবে। এ ধরনের উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী শান্তি ও সহনশীলতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, বক্তব্যে তিনি বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ বৈশ্বিক অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানান এবং এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ তার দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে বলে পুনর্ব্যক্ত করেন।