আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রভাবে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে উল্লেখযোগ্য অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার প্রেক্ষাপটে গত ১৯ মার্চ আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ দশমিক ১৩ মার্কিন ডলারে পৌঁছে যায়, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। তবে পরবর্তী কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতির আংশিক পরিবর্তনের ফলে দাম কিছুটা কমে আসে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ আংশিকভাবে উন্মুক্ত হওয়ার খবর এবং ইরানের তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে সরাসরি হামলা না করার বিষয়ে কিছু প্রতিশ্রুতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করে। এর ফলে ২০ মার্চ গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) ১৬টা ১০ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমে প্রায় ১০৯ দশমিক ৭৫ ডলারে নেমে আসে। যদিও এই দর আগের দিনের তুলনায় ২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি ছিল, তবুও দিনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে এটি উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে অবস্থান করে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক তৎপরতা শুরু হওয়ার পর থেকেই জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ের সংঘাতের কারণে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পায় বলে বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।
মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর হামলার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। দক্ষিণ ইরানের আসালুয়ে অঞ্চলের তেল শোধনাগার এবং দক্ষিণ পার্স প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র-সংযুক্ত স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। এই অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত, ফলে সেখানে কোনো ধরনের বিঘ্ন আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।
এদিকে নিজেদের জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পর ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট তেল স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে অবস্থিত কিছু স্থাপনার বিষয়ে সতর্কতা জারি করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো খালি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এই পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবে তেলের দাম এখনও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সংঘাতের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনায় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। ফলে মূল্য নির্ধারণে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জ্বালানি খাতে এই অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন ও পরিবহন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অগ্রগতির ওপর বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।