আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরান জানিয়েছে, তেহরানের অনুমতি ছাড়া এই প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এখানকার অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে ইউরোপে গ্যাসের দামও বাড়তে শুরু করেছে।
পরিস্থিতি এমন সময়ে জটিল আকার ধারণ করেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া হামলা-পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতায় সংঘাত তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি শনিবার সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালি তেহরানের শত্রুদের জন্য বন্ধ থাকতে পারে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রণালি এলাকায় অন্তত ১৬টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দামে দ্রুত ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মিত্র দেশগুলোর সহযোগিতা চেয়েছেন। এর আগে যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশকে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। তবে এ পর্যন্ত বড় ধরনের সামরিক সহায়তা বা উদ্যোগের ঘোষণা দেখা যায়নি।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, দেশটি বর্তমানে মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে অঞ্চলটির সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে। তবে তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
জাপানের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থান ঘোষণা করা হয়নি। দেশটির স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় এই বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।
চীনও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে বলে জানিয়েছে বেইজিং। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র জানান, চীন অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে এবং স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সব পক্ষের দায়িত্ব বলে মনে করে। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে চীন যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে।
এদিকে ফ্রান্সের পক্ষ থেকেও সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের কোনো ঘোষণা আসেনি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ফরাসি বিমানবাহী রণতরী পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করছে এবং সেটি অন্যত্র পাঠানোর পরিকল্পনা নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, কারণ সংঘাতের পাশাপাশি একাধিক স্থানে সামরিক হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইরানের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী তেহরানসহ কয়েকটি অঞ্চলে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলের শিরাজ শহরের কাছেও একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিম ও মধ্য ইরানে শত শত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। সামরিক সূত্রগুলো দাবি করেছে, বিভিন্ন অভিযানে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের সদস্যসহ বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা হতাহত হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে। ইসরাইলের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে, যার ফলে কয়েকজন আহত হয়েছে বলে দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে ইসরাইলের বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কয়েকটি দেশও সংঘাতের প্রভাব অনুভব করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করেছে। তবে ইরান এসব হামলার দায় অস্বীকার করেছে এবং দাবি করেছে, তাদের ড্রোনের অনুকরণে অন্য পক্ষ হামলা চালিয়ে দায় চাপানোর চেষ্টা করছে।
পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের দ্রুত দেশটি ত্যাগের পরামর্শ দিয়েছে রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস। এর আগে ইরাকেও অনুরূপ সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।
এদিকে যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাপ্তি নিয়ে ভিন্নমুখী বক্তব্য সামনে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংঘাতের অবসান ঘটতে পারে এবং তেলের সরবরাহ পুনরায় স্বাভাবিক হলে জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে। তবে ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।