আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কিউবার চলমান মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ‘বন্ধুত্বপূর্ণ দখল’-এর ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার (৯ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ডোরাল শহরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় ট্রাম্প জানান, কিউবার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, কিউবার বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, “রুবিও বিষয়টি দেখছেন। এটি একটি বন্ধুত্বপূর্ণ দখল হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, কিউবার অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং দেশটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য এমন এক সময় সামনে এসেছে, যখন কিউবায় দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক দুরবস্থা, খাদ্য ও জ্বালানির ঘাটতি এবং মৌলিক পণ্যের সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির অর্থনীতি ক্রমাগত চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন খাতের আয় কমে যাওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর কিউবা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো উচ্চপর্যায়ের আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। হাভানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা বর্তমানে চলছে না।
একই সঙ্গে কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল গুইলারমো রদ্রিগেজের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সরকারিভাবে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। ফলে সম্ভাব্য কূটনৈতিক যোগাযোগ বা আলোচনার বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। ১৯৫৯ সালের কিউবান বিপ্লবের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং পরে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর কয়েক দশক ধরে এই নিষেধাজ্ঞা এবং রাজনৈতিক বিরোধ দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে রেখেছে।
যদিও ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে নানা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নীতিগত পরিবর্তনের কারণে সেই সম্পর্ক স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি। এর ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখনও সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মায়ামিতে বসবাসরত কিউবান নির্বাসিত সম্প্রদায়ের একটি অংশ ট্রাম্পের মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। কয়েক দশক ধরে তারা কিউবার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং সরকারের পতনের প্রত্যাশা করে আসছেন।
মায়ামি এলাকায় কিউবান বংশোদ্ভূত অভিবাসীদের একটি বড় জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে কিউবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সক্রিয়ভাবে মতামত দিয়ে আসছেন। অনেকেই মনে করেন, কিউবার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন, যদিও এ বিষয়ে বিভিন্ন মত ও দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য কৌশল বা নীতিগত অবস্থানের ইঙ্গিত দিতে পারে, তবে বাস্তবে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক আইনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়বে।
এ পরিস্থিতিতে কিউবার অভ্যন্তরীণ সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের মধ্যকার যোগাযোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর পরিস্থিতির অগ্রগতি অনেকটাই নির্ভর করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।