অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যে চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ দশমিক ৭৭ ডলারে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য উচ্চতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সোমবার (৯ মার্চ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে দ্রুত ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে তেলের দামের এই বৃদ্ধি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ ওই পথ ব্যবহার থেকে বিরত থাকছে বলে জানা গেছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক রুট। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালী দিয়ে বিশ্ববাজারে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথের কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা আগাম ঝুঁকি বিবেচনায় তেল ক্রয়ে আগ্রহী হচ্ছেন। এর ফলেই তেলের দামে দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ২৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে এত দ্রুত দামের উত্থান বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর আগে ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা গেলেও বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন ধরনের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত।
বিশ্ব অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সম্পদের ওপর এখনও বিশ্ব অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভরশীল। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ফলে ওই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বা পরিবহন ব্যাহত হলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে উত্তেজনা কমে এলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উচ্চমূল্যের জ্বালানি সরাসরি উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। এতে অনেক দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি চলতি বছরের প্রথমার্ধে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।