আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা আঘাত অব্যাহত থাকায় দুই দেশেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ইরানে অনেক মানুষ নিরাপত্তার কারণে বড় শহর ছেড়ে গ্রামীণ এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে সাইরেন বাজলে মানুষ বাংকার, আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন ও নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
জেরুজালেম, তেল আবিব ও হাইফাসহ ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আকাশপথে হামলার আশঙ্কা থাকায় অধিকাংশ বাসিন্দা নিজ নিজ ভবনের ভূগর্ভস্থ আশ্রয়স্থল বা সরকারি নিরাপত্তা বাংকারে অবস্থান করছেন। অনেক ক্ষেত্রে বাসাবাড়িতে পর্যাপ্ত আশ্রয়ব্যবস্থা না থাকায় মানুষকে নিকটবর্তী পাতাল রেলস্টেশন, গ্যারেজ বা ধর্মীয় উপাসনালয়ের নিচতলায় অবস্থান নিতে হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার একটি টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রামাণ্যচিত্রে তেল আবিবের একটি হাসপাতালের প্রস্তুতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, হাসপাতালটির ভূউপরি অংশের পাশাপাশি মাটির নিচে দুই তলা বিশিষ্ট একটি বিশেষ চিকিৎসা ইউনিট নির্মাণ করা হয়েছে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য এই আন্ডারগ্রাউন্ড অংশে প্রায় ২৫০ জন রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক ব্রিয়ান ফ্রেডম্যান জানান, ইরানের হামলা শুরুর পরপরই হাসপাতালে থাকা রোগীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ভূগর্ভস্থ ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। তিনি বলেন, সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের অবকাঠামো প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংঘাতের কারণে আহত ব্যক্তিদেরও সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ এই ইউনিটে জরুরি অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম রাখা হয়েছে, যাতে হামলার মধ্যেও চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়।
ইসরায়েলের একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছরের জুনে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের সময় যেভাবে মানুষ বাংকারে আশ্রয় নিয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ধরনের চিত্র আবার দেখা যাচ্ছে। নিরাপত্তা সতর্কতার অংশ হিসেবে অনেক এলাকায় নিয়মিত সাইরেন বাজানো হচ্ছে, যাতে বাসিন্দারা দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে পারেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, তেল আবিবের বিভিন্ন ভবনের নিচে এবং পাতাল রেলস্টেশনগুলোতে সাধারণ মানুষ অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন। কেউ প্রয়োজনীয় খাবার ও ব্যক্তিগত সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে সেখানে গেছেন। অনেকে সময় কাটানোর জন্য বই পড়ছেন বা মেঝেতে বিছানা পেতে বিশ্রাম নিচ্ছেন।
তেল আবিবে আশ্রয় নেওয়া এক ব্যক্তি খসরো নেমাতি, যিনি ইরানি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক, বলেন যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছেন তিনি। হামলা শুরু হওয়ার পরপরই শহরের অনেক মানুষ স্থানীয় সিনাগগ, বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যারেজ এবং পাতাল রেলস্টেশনে আশ্রয় নেন। তেল আবিবের অ্যালেনবি স্টেশনে আশ্রয় নেওয়া ইসরায়েল হায়ওম নামের এক বাসিন্দা জানান, তিনি যে ভবনে বসবাস করেন সেখানে কোনো নিরাপদ আশ্রয়স্থল নেই। এ কারণে বাধ্য হয়ে রেলস্টেশনে আশ্রয় নিতে হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, তেল আবিবের কয়েকটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভবনের কাচ ভেঙে রাস্তার পাশে ছড়িয়ে রয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও উদ্ধারকর্মীরা এসব ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে পরিষ্কার করার কাজ করছেন।
এক পাতাল রেলস্টেশনে আশ্রয় নেওয়া আনা নেসতেরোভা নামের এক নারী জানান, তিনি যে ভবনে থাকেন সেখানে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়স্থল থাকলেও একা থাকার কারণে ভয় অনুভব করছিলেন। তাই অন্যদের সঙ্গে নিরাপদ স্থানে থাকতে তিনি স্টেশনে চলে আসেন। তার সঙ্গে একটি পোষা কুকুরও রয়েছে। একই স্টেশনে অনেক মানুষকে বেঞ্চে বসে বা শুয়ে রাত কাটাতে দেখা যায়।
আরেকজন বাসিন্দা লুসেট জানান, হামলার কারণে তিনি রাতভর স্টেশনে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে তেল আবিবের বাসিন্দা ও এক সন্তানের মা সাকেজ জিভি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সাম্প্রতিক হামলায় তার বাসা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায়ই সাইরেন বাজছে। সাইরেন শোনামাত্রই তাকে ও তার পরিবারকে দ্রুত আন্ডারগ্রাউন্ড শেল্টারে যেতে হয়।
তিনি আরও জানান, তার দেড় বছর বয়সী সন্তানও এখন সাইরেনের শব্দ শুনে বুঝতে পারে যে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে দিনের অনেকটা সময় তারা খোলা জায়গায় বা অস্থায়ীভাবে নিরাপদ স্থানে কাটাচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং এর প্রভাব আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।