আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ভারতের বন্দর ব্যবহার করছে—এমন অভিযোগ ওঠার পর তা নাকচ করেছে ভারত সরকার। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মার্কিন বাহিনী ভারতীয় বন্দর ব্যবহার করছে—এ সংক্রান্ত দাবি “মিথ্যা ও ভিত্তিহীন”।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর উপদেষ্টা ডগলাস ম্যাকগ্রেগর-এর এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্ক-এ সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মার্কিন নৌবাহিনী সম্ভবত ভারতের বন্দর ব্যবহার করছে। তার এই বক্তব্য সামাজিক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়।
এ প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত ভারতীয় বন্দর ব্যবহারের দাবি সম্পূর্ণ ভুয়া। বিবৃতিতে বলা হয়, “ভারতীয় বন্দর ব্যবহারের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা অসত্য ও ভিত্তিহীন। এ ধরনের বানোয়াট মন্তব্যের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।” তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ উত্থাপনের সময়কালটিও তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনায় আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বুধবার শ্রীলঙ্কার জলসীমায় অবস্থানকালে একটি মার্কিন সাবমেরিনের হামলায় ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ডুবে যায় বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। জাহাজটি ভারতীয় জলসীমায় মহড়া শেষে ফেরার পথে ছিল বলে জানা গেছে।
ঘটনাটি দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ভারত ঐতিহ্যগতভাবে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর নীতি অনুসরণ করে থাকে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ালেও একই সঙ্গে ইরানসহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ফলে ভারতের বন্দর ব্যবহার করে সম্ভাব্য সামরিক অভিযান চালানোর অভিযোগ দেশটির পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লজিস্টিক সহায়তা চুক্তিসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সমঝোতা হয়েছে, যার মাধ্যমে দুই দেশের সামরিক বাহিনী নির্দিষ্ট শর্তে একে অপরের সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করতে পারে। তবে এসব চুক্তি মূলত রসদ ও রক্ষণাবেক্ষণ সহযোগিতার জন্য; সরাসরি তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে সামরিক হামলায় অংশগ্রহণের প্রশ্নে ভারত সাধারণত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে থাকে।
অন্যদিকে, ইরানের যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবুও ঘটনাটি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সার্বিক প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ভারতীয় বন্দর ব্যবহার করছে—এ অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে ভারত নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তবে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবির ঘটনা এবং এ সংক্রান্ত পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা আগামী দিনগুলোতে দক্ষিণ এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।