আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ সুদানের উত্তরাঞ্চলে অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৬৯ জন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় রোববার (১ মার্চ) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে একদল সশস্ত্র যুবক আবিয়েমনম কাউন্টিতে এ হামলা চালায়। প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে ঘরবাড়ি ও বাজারে অগ্নিসংযোগ করা হয়। নিহতদের মধ্যে শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি, পুলিশ ও আঞ্চলিক বাহিনীর সদস্য ছাড়াও স্থানীয় কাউন্টি কমিশনার ও নির্বাহী পরিচালক রয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। পরিস্থিতির অবনতির কারণে অনেক মরদেহ গণকবরে দাফন করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, হামলাকারীরা পার্শ্ববর্তী ইউনিটি রাজ্য থেকে এসেছে এবং তারা বিরোধী রাজনৈতিক দল Sudan People’s Liberation Army–In Opposition (এসপিএলএ-আইও)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তবে এসপিএলএ-আইও এ অভিযোগ অস্বীকার করে একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। ঘটনার পর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
হামলার সময় অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরের দিকে হঠাৎ গুলিবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ শুরু হলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিকবিদিক ছুটতে থাকেন। অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় এক হাজার মানুষ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা ঘাঁটির আশপাশে আশ্রয় নিয়েছেন। মানবিক সহায়তার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সহিংসতার কারণে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা Médecins Sans Frontières (এমএসএফ) তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের ২৬ জন কর্মী নিখোঁজ রয়েছেন এবং একটি স্থাপনায় বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে তারা অভিযোগ করেছে। নিখোঁজ কর্মীদের সন্ধানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এমএসএফের সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আহত ও অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা সঙ্কট আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ সুদানের সাম্প্রতিক সহিংসতা ২০১৮ সালের শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সে বছর সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে সংঘাত অবসানে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের ইতি টেনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সশস্ত্র সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় চুক্তির বাস্তবায়ন বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে, বিদ্যমান উত্তেজনা প্রশমিত না হলে দেশটি আবারও বড় ধরনের গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জাতিগত বিরোধ সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। খাদ্য সংকট, বাস্তুচ্যুতি এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
২০১১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দক্ষিণ সুদান ধারাবাহিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে রয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই শুরু হওয়া ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেশটিকে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত করে, যার ফলে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হন এবং বিপুল প্রাণহানি ঘটে। সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা সেই অস্থিরতার ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে আবিয়েমনম কাউন্টিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থির রয়েছে। প্রশাসন হামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে এবং দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সহিংসতা আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।