আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দেশীয় প্রযুক্তিতে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ উৎপাদন শিল্পকে স্বাবলম্বী ও বৈশ্বিক কেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্যে একটি বড় মাইলফলক অর্জন করেছে ভারত। দেশটির গুজরাট রাজ্যে ভারতের প্রথম বাণিজ্যিক ‘ফ্রন্ট-এন্ড সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট’ বা চিপ তৈরির কারখানা স্থাপনে নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত চিপ উৎপাদন সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘এএসএমএল’-এর সাথে একটি কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে টাটা ইলেকট্রনিক্স। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেতেনের উপস্থিতিতে এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
শনিবার (১৬ মে) উভয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পাঠানো একটি যৌথ বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, লিথোগ্রাফি প্রযুক্তির বৈশ্বিক বাজারের শীর্ষস্থানীয় ডাচ প্রতিষ্ঠান এএসএমএল তাদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও সমাধান দিয়ে টাটা ইলেকট্রনিক্সের এই মেগা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা দেবে। গুজরাটের ধোলেরায় প্রায় ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি) ব্যয়ে এই আধুনিক চিপ কারখানাটি নির্মাণ করছে টাটা গ্রুপ। কারখানাটিতে মূলত বিদ্যুৎচালিত ও স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, স্মার্টফোন, আধুনিক গ্যাজেট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত ৩০০-মিলিমিটার (১২ ইঞ্চি) আকৃতির বাণিজ্যিক সিলিকন ওয়াফার ও চিপ উৎপাদন করা হবে।
যৌথ বিবৃতিতে এএসএমএল-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ক্রিস্টোফ ফুকে বলেন, ভারতের সেমিকন্ডাক্টর খাতের দ্রুত বিকাশ বৈশ্বিক বাজারের জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় দিক। এ অঞ্চলে একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে এএসএমএল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। টাটা ইলেকট্রনিক্সের সাথে এই সমঝোতা স্মারক ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং স্থানীয় মানবসম্পদ উন্নয়নে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। টাটা ইলেকট্রনিক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. রণধীর ঠাকুর জানান, লিথোগ্রাফি শিল্পের বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানের এই সহযোগিতা ধোলেরা কারখানার দ্রুত উৎপাদন কার্যক্রমে যাওয়া নিশ্চিত করবে এবং বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে একটি নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ চিপ সরবরাহ চেইন গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী নেদারল্যান্ডসের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি, বন্দর, তথ্যপ্রযুক্তি ও লজিস্টিক খাতের ব্যবসায়ীদের সাথে এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ডাচ কোম্পানিগুলোকে ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল সেমিকন্ডাক্টর, নবায়নযোগ্য শক্তি, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষভাবে আহ্বান জানান। একই সাথে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপের বৈশ্বিক বাজারে এই চুক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চিপ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের এক তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। ভারত সরকার নিজেদের দেশে চিপের উৎপাদন বাড়াতে এবং বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকৃষ্ট করতে শত শত কোটি ডলারের বড় অঙ্কের সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্যাকেজ (পিএলআই স্কিম) ঘোষণা করেছে। গুজরাটের এই প্রকল্পে কেন্দ্রীয় সরকার প্রায় ৫০ শতাংশ এবং রাজ্য সরকার ২০ শতাংশ আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে চলমান দীর্ঘমেয়াদী ভূরাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দ্বন্দের কারণে বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ চেইনে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের নানামুখী বিধিনিষেধের কারণে ডাচ সেমিকন্ডাক্টর এবং লিথোগ্রাফি সরঞ্জাম উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো এখন চীনের বিকল্প হিসেবে নতুন ও নিরাপদ এশীয় বাজার খুঁজছে। এই কৌশলগত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মোদি সরকার ভারতকে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক চিপ উৎপাদন হাব বা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার নীতিগত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তাই টাটা ও এএসএমএল-এর এই অংশীদারিত্ব কেবল ভারতের চিপ ঘাটতিই দূর করবে না, বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে দেশটির অংশীদারিত্ব অনেকাংশে বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।