অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত সামরিক হামলার জেরে ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এই সংঘাত যদি আঞ্চলিকভাবে জটিল রূপ নেয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যে কোনো সরবরাহ ব্যাহত হলে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই রুটে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিমধ্যেই এর প্রভাব দেখা গেছে; গত শুক্রবার অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৬৭ ডলারে পৌঁছেছে। ১৭ ফেব্রুয়ারিতে যেখানে দাম ছিল ৬১ ডলার, সেখানে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার কারণে বাজারে অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বৈঠক ফলহীন হওয়ার পর থেকেই এই পরিস্থিতি তীব্রতর হয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সরাসরি হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। দেশের প্রাথমিক জ্বালানির প্রায় ৯০ শতাংশ—অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি ও এলএনজি—এই রুটের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করে। প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলো, যেমন সৌদি আরব, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, থেকে জ্বালানি আনার ক্ষেত্রে বর্তমানে বিকল্প সমুদ্রপথ নেই।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য মূলত দুটি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রথম, মূল্যঝুঁকি: আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং এলএনজি আমদানিকারকদের আমদানি ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এতে সরকারের ওপর ভর্তুকি চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে বা দেশীয় বাজারে জ্বালানির দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। দ্বিতীয়, সরবরাহঝুঁকি: হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে বা বীমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পেলে শিপমেন্ট বিলম্বিত হতে পারে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
জ্বালানি সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে, যা শিল্পখাতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করে এবং জ্বালানিনির্ভর রপ্তানি পণ্যগুলোকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা দেশে মুদ্রাস্ফীতির পুনরায় বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে।
জ্বালানি বিশ্লেষকরা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশকে বিকল্প সরবরাহ উৎসের সন্ধান, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যচুক্তি নিশ্চিতকরণ এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত বৃদ্ধি বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। এগুলো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে।