আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে আরও মার্কিন সেনা হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় রোববার ইরান পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ আশঙ্কার কথা জানান। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, অভিযানের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তিনজন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত এবং অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন।
সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বয়ে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় (ইএসটি) সকাল ৯টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত তিন সেনা সদস্যের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানানো হয়। এছাড়া আরও কয়েকজন সামরিক সদস্য শার্পনেল আঘাত ও মস্তিষ্কে আঘাতজনিত সমস্যায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। তিনি বলেন, অভিযান শেষ হওয়ার আগে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে, তবে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো হবে।
সেন্টকম জানায়, শনিবার ইএসটি সময় রাত ১টা ১৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে। এতে বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান, এফ-১৬, এফ-১৮ ও এফ-২২ যুদ্ধবিমান এবং এম-১৪২ হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেমসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযানের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ইরানের কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর যৌথ ও মহাকাশ বাহিনীর সদর দপ্তর, সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, নৌবাহিনীর জাহাজ ও সাবমেরিন এবং সামরিক যোগাযোগ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সেন্টকম।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানের অন্তত নয়টি নৌযান এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে। সেন্টকম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে।
অভিযানের প্রেক্ষাপটে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, যৌথ হামলায় খামেনিসহ দেশটির কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। তবে এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিস্তারিত বিবৃতি সীমিত আকারে পাওয়া গেছে।
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে জানা যায়, একটি অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। পরিষদে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ফকিহ সদস্য আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি এবং বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেন মোহসেনি-এজেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অন্তর্বর্তী কাঠামো ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ক্ষমতার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস, সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের অস্ত্র ত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যথায় কঠোর সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে বলে তিনি সতর্ক করেন। পাশাপাশি তিনি ইরানের জনগণকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
রোববার এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানে পরিচালিত সামরিক অভিযান আনুমানিক চার সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি পূর্বপরিকল্পিত সময়সীমা এবং অভিযানের পরিসর বিবেচনায় এমন সময় লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ এই সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। একই সঙ্গে বেসামরিক নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতির অগ্রগতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা।