অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ ও বিদ্যমান বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তনশীল বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি; সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যসম্পর্কিত বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান। বৈঠকে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কসংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো এখনো বিকাশমান অবস্থায় রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটির সর্বোচ্চ আদালত পূর্বে আরোপিত কিছু ট্যারিফ অকার্যকর ঘোষণা করেছে। এরপর নতুন করে বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে এ সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো লিখিত নির্দেশনা বা কূটনৈতিক যোগাযোগ পায়নি। ফলে পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য সময় প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কিছু সিদ্ধান্ত দেশটির কংগ্রেসে অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণ করা কঠিন। এ প্রেক্ষাপটে সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিদ্যমান বাণিজ্যচুক্তি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রে সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ—উভয় দিকই থাকে; তাই জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় সব দিক বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
চুক্তি প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্নে মন্ত্রী জানান, আলোচনার সময় কিছু ক্ষেত্রে গোপনীয়তা চুক্তি (নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট) কার্যকর ছিল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় এ ধরনের বিধান অস্বাভাবিক নয়। তবে বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় এবং সংশ্লিষ্ট দেশ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ায় এ পর্যায়ে কোনো মন্তব্য বা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয় বলে তিনি মত দেন।
বৈঠকে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বিভিন্ন খাতভিত্তিক সমস্যার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে সম্ভাব্য শুল্কবৃদ্ধির প্রভাব রপ্তানি খাত, তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্যের ওপর কীভাবে পড়তে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়। সরকার এসব মতামত বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেবে বলে মন্ত্রী জানান।
রমজানকে সামনে রেখে বাজার পরিস্থিতি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, রমজানের শুরুতে অনেক ভোক্তা একসঙ্গে এক মাসের পণ্য কেনেন, ফলে সাময়িকভাবে কিছু পণ্যের দামে অস্থিরতা দেখা দেয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেবুর দাম স্বল্প সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল, পরে আবার স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে। বাজারে কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারের তদারকি অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। বর্তমান সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে চায়।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির যেকোনো পরিবর্তন দেশের রপ্তানি আয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তুতি রাখছে বলে বৈঠক-পরবর্তী বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।