বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রধান ও জীবনদানকারী নদীগুলো বর্তমানে চরম পরিবেশগত সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে। এসব নদী মানবসমাজ, অন্যান্য প্রাণী ও বিশ্ব বাণিজ্যকে বছরের পর বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নদীগুলোর অবস্থা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার এক সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বিগত তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে ২০২৫ সালে এসে পৃথিবীর নদীগুলো সবচেয়ে শুষ্ক ও কঠিন এক বছরের মুখোমুখি হয়েছে। এই করুণ বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’ শুরু করতে যাচ্ছে ‘আওয়ার রিভার্স’ নামে বছরব্যাপী এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রকল্প। পত্রিকার পরিবেশ বিষয়ক নিয়মিত আয়োজন ‘ডাউন টু আর্থ’ সংবাদের সম্পাদক বিবি ভ্যান ডার জি নদী রক্ষা ও তাদের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে একটি বিস্তারিত আলোচনা প্রকাশ করেছেন।
পৃথিবীর প্রধান নদীগুলোকে মানুষ বহু আগে থেকেই শ্রদ্ধা ও আদরের বিভিন্ন ডাকনামে ডেকে এসেছে। যেমন, ‘দ্য গ্রেট রিভার’, ‘সব নদীকে গিলে খাওয়া নদী’, ‘মা গঙ্গা’ কিংবা ‘ওল্ড ফাদার টেমস’। এসব নদী কেবল পানীয় জল আর খাবারের সংস্থানই করে না, বাণিজ্য পরিবহন ও গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপে প্রশান্তিও যোগায়। মানব অস্তিত্বের সঙ্গে গভীর অনুভূতি আর শ্রদ্ধার নাম এসব নদী আজ জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিয়ন্ত্রিত মানব কর্মকাণ্ডের কারণে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ব্রাজিলের আমাজন ও লাতিন আমেরিকার লা প্লাটার মতো বিশালাকার নদী অববাহিকাগুলো বর্তমানে মারাত্মক খরার সম্মুখীন। অন্যদিকে, আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীও বাৎসরিক মৌসুমি বায়ুর স্বাভাবিক ধরণ এবং সময়সূচি বদলে যাওয়ায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি আফ্রিকার সবচেয়ে গভীর এবং বিষুবরেখাকে দুইবার অতিক্রম করা দীর্ঘ কঙ্গো নদীও গত কয়েক দশক ধরে ক্রমান্বয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, ওয়াকার সার্কুলেশনের দুর্বলতা এবং মধ্য-পূর্ব গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আটলান্টিক মহাসাগরের পৃষ্ঠদেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই নদীটি আজ শুষ্কতার মুখে পড়েছে।
শুধু প্রাকৃতিকভাবে নদী শুকিয়ে যাওয়াই একমাত্র সমস্যা নয়, মানুষের তৈরি অনিয়ন্ত্রিত ইঞ্জিনিয়ারিং বা অবকাঠামোগত হস্তক্ষেপ নদীগুলোকে আরও জটিল অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। নদীর উৎস থেকে শুরু করে মোহনা পর্যন্ত যথেচ্ছ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা বিশ্বজুড়ে বহু রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো নদীর পানি বণ্টন নিয়ে যেমন অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে বৈরী পরিস্থিতি বিদ্যমান, তেমনি নীল নদকে কেন্দ্র করে মিসর ও ইথিওপিয়ার বহু বছরের কূটনৈতিক টানাপোড়েন সম্প্রতি কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। আবার অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি নদীর পানি প্রবাহ অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে কৃত্রিম খাল খনন করা হয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে বর্তমানে সমুদ্রের লোনা পানি তীব্রভাবে মূল নদীর ভেতরের দিকে প্রবেশ করছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা তার ভয়াবহ পরিণাম ভোগ করছেন।
তবে আশার কথা হচ্ছে, অনেক দেশেই স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নদীকে আবার তার স্বাভাবিক রূপ ও গতি ফিরিয়ে দেওয়ার নানামুখী প্রয়াস চালাচ্ছে। চীন সরকার ইয়াংসি নদী পুনরুজ্জীবিত করতে বিশাল আর্থিক বিনিয়োগ ও সংস্কারমূলক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এর সুফলও আসতে শুরু করেছে; জীববিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে সেখানে মাছের বংশবৃদ্ধি দ্বিগুণ হয়েছে এবং বিলুপ্তপ্রায় বহু জলজ প্রাণী আবার তাদের আবাসে ফিরতে শুরু করেছে।
অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের কারণে নদীর দূষণ বিশ্বজুড়ে আরেকটি তীব্র ক্ষোভের কারণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যে বছরের পর বছর ধরে নদীতে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য ফেলা হচ্ছে, যা রোধে সরকারি উদ্যোগের অভাব দেখে স্থানীয় জনগণ ও সম্প্রদায় নিজেরাই নদী সুরক্ষায় এগিয়ে আসছে। অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে আর্জেন্টিনাতেও, দেশটির দ্বিতীয় দূষিত নদী ‘রেকনকুইস্তা’-কে রক্ষায় গবেষকরা একটি সম্পূর্ণ জৈব সমাধান উদ্ভাবন করেছেন। নদী সংলগ্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এখন সেই পলি অপসারণ ও নদীর পরিবেশগত পুনরুজ্জীবনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।