অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের উপজেলা পর্যায়ের সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীদের আত্মনির্ভরশীল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ‘উদ্যোগ: উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত প্রত্যেক উদ্যোক্তাকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন সুবিধা প্রদান করা হবে। যার অর্ধেক ব্যাংকঋণ এবং বাকি অর্ধেক অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কর্মসূচির আওতায় তফসিলি ব্যাংকগুলো তাদের বিদ্যমান শাখা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান ও চিহ্নিত করবে। এরপর উদ্যোক্তার ব্যাবসায়িক ধারণা ও প্রকৃত অর্থের চাহিদা যাচাই করে অর্থায়ন নিশ্চিত করা হবে। নির্বাচিত প্রত্যেক উদ্যোক্তা তার প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার অর্থায়ন প্যাকেজ পাবেন। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং ১০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। গ্রাহক পর্যায়ে এই ঋণের সুদ বা মুনাফার হার সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ঋণের বিপরীতে কোনো সহায়ক জামানতের প্রয়োজন হবে না। তবে নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অনুদানের অর্থ সুদবিহীন ঋণে রূপান্তরিত হবে এবং ঋণ হিসাবটি প্রচলিত নিয়মে শ্রেণীকৃত হয়ে খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ফলে পরবর্তীতে ওই উদ্যোক্তা যেকোনো ধরনের ব্যাংকঋণ পাওয়ার যোগ্যতা হারাবেন।
আবেদনের যোগ্যতার ক্ষেত্রে শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হতে হবে এবং আবেদনের শেষ তারিখে তার বয়স অনূর্ধ্ব ২৮ বছর হতে হবে। পাশাপাশি তাকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। পূর্বে ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক না থাকলেও আবেদনকারীর একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই ব্যাবসায়িক ধারণা থাকতে হবে। কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কুটির শিল্প ও হস্তশিল্প, মৎস্য চাষ, পশুপালন, পর্যটন, সেবা খাত কিংবা প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগসহ সব ধরনের বৈধ ব্যবসা এই কর্মসূচির আওতায় বিবেচনা করা হবে। আবেদন সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে সম্পন্ন করা যাবে এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলার অধিবাসী যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় নির্ধারিত ফরমের মাধ্যমে আবেদন জমা দিতে পারবেন।
এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিস্তারিত নির্দেশনা সংবলিত সার্কুলার আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর জারি করা হবে বলে জানানো হয়েছে। সার্কুলার জারির পর থেকে পরবর্তী এক মাস পর্যন্ত আবেদন গ্রহণের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আট বিভাগের আটটি জেলা—মানিকগঞ্জ, ফেনী, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, ভোলা, হবিগঞ্জ, রংপুর ও নেত্রকোনা—এর অন্তর্ভুক্ত মোট ৬৪টি উপজেলায় এই কর্মসূচি পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হবে। প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে মোট ৬৪০ জন তরুণ উদ্যোক্তাকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হবে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য জেলার উপজেলাগুলোতেও এই কর্মসূচি সম্প্রসারিত করা হবে। তখন প্রতি বছর দেশের প্রায় ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তাকে আর্থিক সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই কর্মসূচির পরিধি কেবল আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। নির্বাচিত তরুণ উদ্যোক্তারা পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞ মেন্টর বা পরামর্শকদের ধারাবাহিক পরামর্শ, ব্যবসা নিবন্ধন, সঠিক ব্যাবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা এবং উৎপাদিত পণ্যের জন্য আধুনিক বাজার সংযোগের সুযোগ লাভ করবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, এই যুগান্তকারী কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে সফল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা গড়ে উঠবে, যা স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এর মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে উপজেলা পর্যায়ের তরুণ সমাজের কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।