আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির সরকারি স্কুলগুলোতে কিন্ডারগার্টেন থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম ও প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব কমানোর একটি সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ হিসেবে স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ এই কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। এক বছর মেয়াদি এই সিদ্ধান্তের ফলে শহরটির প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী সরাসরি প্রভাবিত হবে, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সমাজের মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় মৌলিক মননশীলতার চর্চা নিশ্চিত করতেই মূলত এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি ও সিটি স্কুল চ্যান্সেলর কামার স্যামুয়েলস যৌথভাবে এই নতুন নীতি ঘোষণা করেন। এই সিদ্ধান্তের আওতায় শহরটির শিক্ষা বিভাগ পূর্বে যেসব শিক্ষামূলক সফটওয়্যার ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছিল, তার মধ্য থেকে ৩৮টিরও বেশি জনপ্রিয় প্রোগ্রামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট উপাদানসমূহ অবিলম্বে বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় করা হচ্ছে। শিক্ষা কর্র্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান শিক্ষাবর্ষের নির্ধারিত ডিজিটাল নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মানদণ্ড পূরণ করতে না পারায় এই সফটওয়্যারগুলোর কার্যকারিতা সীমিত করা হয়েছে। তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এবং ইংরেজি ভাষা শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্বপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই নিয়মের বিশেষ ছাড় বা অব্যাহতি রাখা হয়েছে, যাতে তাদের স্বাভাবিক শিখন প্রক্রিয়া ব্যাহত না হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের ক্রমবর্ধমান স্ক্রিনটাইম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবাধ ব্যবহার নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে তীব্র উদ্বেগ ও বিধিনিষেধের দাবি জোরালো হয়ে উঠছিল। অপর দিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি পরিচালনাকারী বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সফটওয়্যার নির্মাতা কর্র্তৃপক্ষ দাবি করে আসছে যে, এই ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মেধা বিকাশ এবং জটিল সমস্যা সমাধানে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। পক্ষান্তরে, শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, অতিমাত্রায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীলতা, বানান জ্ঞান এবং মৌলিক লেখার দক্ষতাকে সংকুচিত করে ফেলে।
নিউইয়র্ক সিটির এই সিদ্ধান্তকে বর্তমান সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাঙ্গনে অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিধিনিষেধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা সীমিত পরিসরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সুযোগ লাভ করবে। বিশেষ করে তাদের জন্য একটি বিশেষ ‘এআই ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ কোর্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির সুফল ও কুফল সম্পর্কে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ধারণা লাভ করবে। এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তির অপব্যবহার থেকে দূরে রেখে ডিজিটাল সাক্ষরতার সঠিক পাঠ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডির বাইরে শিক্ষার্থীরা নিজ গৃহে বা ব্যক্তিগত ডিভাইসে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করার সুযোগ পেতে পারে। এই বাস্তবতায় কেবল বিদ্যালয় নয়, বরং অভিভাবকদেরও নিজ নিজ বাসগৃহে সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সময়সীমা এবং এর গতিপ্রকৃতির ওপর কড়া নজরদারি বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। আগামীতে এই নীতির সুদূরপ্রসা গী প্রভাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়নের জন্য শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সার্বিক পর্যালোচনার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধনী ও চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা প্রদান করা হবে।