বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে এ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও গভীর করতে উভয় দেশ সমন্বিতভাবে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। গত রাতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরেন। কূটনৈতিক সম্পর্কের এই ইতিবাচক ধারাবাহিকতা ধরে রেখে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি এবং মানবিক সহায়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন তিনি। এ সময় সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সম্প্রতি ম্যানিলায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং বিশেষ দূত সার্জিও গরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ধারাবাহিকতায় এই স্বল্পপরিসরের আলোচনাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা এবং সম্ভাব্য সহযোগিতার খাতগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি দেশের বিকাশমান বেসরকারি খাতও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয় করছে, যা দুই দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের একটি স্পষ্ট ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয় রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বাংলাদেশ যে মোট মানবিক সহায়তা পায়, তার অর্ধেকেরও বেশি সংস্থান করে যুক্তরাষ্ট্র। সংকট সমাধানের টেকসই পথ খুঁজে বের করতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক নীতি অনুসরণ করে রাজনৈতিক ও উন্নয়নমূলক সম্পর্ক বেগবান রেখেছে বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাণিজ্যিক শুল্ক কাঠামোর নতুন সমীকরণ ব্যাখ্যা করে ড. খলিলুর রহমান বলেন, মার্কিন নতুন শুল্ক নীতি নিয়ে যে বিভ্রান্তি ছিল, তা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত পর্যায়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের তদন্ত ও আইনি পর্যালোচনার পর বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি শুল্ক ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় সুবিধাজনক। এর পাশাপাশি মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি বিশেষ ‘ট্যারিফ কোটা ব্যবস্থা’ চালু করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার অধীনে বাংলাদেশে উৎপাদিত পোশাকে যদি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা বা কৃত্রিম তন্তু (ম্যান-মেইড ফাইবার) ব্যবহার করা হয়, তবে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা মার্কিন বাজারে অতিরিক্ত শুল্ক সুবিধা ও অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পাবেন। এটি বাংলাদেশের পোশাক খাতের বাণিজ্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মানবাধিকার ইস্যুতে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমান প্রশাসন মানবাধিকার রক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে নিয়মিত কূটনৈতিক আলোচনা চলমান রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোন সংস্থার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বা এই সংক্রান্ত কারিগরি বিষয়ে উক্ত বৈঠকে কোনো বিস্তারিত আলোচনা হয়নি, কারণ এগুলো একটি চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বৈঠকের অন্যতম কূটনৈতিক তাৎপর্য তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। বিশ্বসভার এই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে জাতিসংঘের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা আরও জোরদার হবে। উদীয়মান প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) আন্তর্জাতিক প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও কৌশলসমূহ এখনো বিবর্তনশীল পর্যায়ে রয়েছে। বৈশ্বিক নতুন এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে বিশ্বনেতারা কৌশলগত পদক্ষেপ পর্যালোচনা করছেন।