আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মরক্কো সীমান্তসংলগ্ন স্পেনের দুই ছিটমহল সিউটা ও মেলিলায় অবৈধ অভিবাসীদের অনুপ্রবেশ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ইউরোপজুড়ে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে স্পেনের সঙ্গে ইউরোপের মুক্ত সীমান্তসংক্রান্ত ঐতিহাসিক ‘সেনজেন চুক্তি’ স্থগিত করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইতালি। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে জরুরি মানবিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
গত বুধবার (২৯ জুলাই) থেকে শত শত অভিবাসী সমুদ্র ও স্থলপথে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশের চেষ্টা চালান। এতে করে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত ছিটমহল সিউটায় চরম মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি সামাল দেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সিউটার আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট হুয়ান জেসুস ভিভাস সামগ্রিক পরিস্থিতিকে একটি গুরুতর মানবিক ও সামাজিক জরুরি অবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সংকট মোকাবিলায় মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় সরকারকে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
স্পেনের এই সীমান্ত সংকট ইউরোপের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলেছে। পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে কঠোর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ অভিবাসন ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। ইতালি সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে এবং প্রয়োজন হলে স্পেনের সাথে সেনজেন সীমান্ত সুবিধা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হতে পারে বলে সংকেত দিয়েছে। উদ্ভূত নিরাপত্তা ঝুঁকি পর্যালোচনা ও পরবর্তী কৌশল নির্ধারণে নিজ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তাদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের এক জরুরি বৈঠক ডেকেছেন ইতালীয় প্রধানমন্ত্রী।
অন্যদিকে, স্পেনের ভেতরেও এ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত সম্প্রতি সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের তাৎক্ষণিক বা জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। আদালতের এই রায়ের ফলে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। স্পেনের প্রধান বিরোধী দল ‘পিপলস পার্টি’ এবং ডানপন্থী ‘ভক্স পার্টি’ সরকারের অভিবাসন নীতি ও দুর্বল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার তীব্র সমালোচনা করেছে। বিরোধীরা এটিকে ভূখণ্ডগত নিরাপত্তার ওপর আঘাত হিসেবে আখ্যা দিয়ে সরকারের অবিলম্বে পদত্যাগ ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।
ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকেও বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। জার্মানির বিরোধী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)-র সহ-সভাপতি অ্যালিস ভাইডেল বর্তমান পরিস্থিতিকে ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক ইউরোপীয় অভিবাসন সংকটের সাথে তুলনা করেছেন। ইউরোপের নিরাপত্তা বজায় রাখতে তিনি অবিলম্বে সকল আন্তর্জাতিক সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার দাবি জানান।
ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত স্পেনের সিউটা ও মেলিলা অঞ্চল দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরাসরি স্থল সীমান্ত যুক্ত রয়েছে কেবল এই অঞ্চল দুটিতেই। ফলে আফ্রিকান অভিবাসীদের ইউরোপে প্রবেশের ক্ষেত্রে এটি অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর আগে ২০২১ সালে মরক্কো সীমান্ত দিয়ে আট হাজারের বেশি অভিবাসী একযোগে সিউটায় প্রবেশ করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমান সংকটটি ২০২১ সালের ঘটনার পর ওই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় ও গুরুতর অনুপ্রবেশের ঘটনা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৯টি দেশের মধ্যে পাসপোর্টহীন মুক্ত চলাচলের সুবিধা প্রদানকারী সেনজেন অঞ্চলের নিরাপত্তা বজায় রাখা নিয়ে বর্তমানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে গভীর দ্বিধা তৈরি হয়েছে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় সরকারগুলোর অক্ষমতা ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ঐক্যের এই অন্যতম ভিত্তি টিকে থাকার ক্ষেত্রে বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।