আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সামরিক হামলার ভিডিওচিত্রে অননুমোদিতভাবে গান ব্যবহারের অভিযোগ তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক কেন্দ্র হোয়াইট হাউসের ওপর তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পপ তারকা ক্যাটি পেরি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে প্রখ্যাত এ শিল্পীর জনপ্রিয় গান ‘ফায়ারওয়ার্ক’ যুক্ত করা হয়, যা সম্পূর্ণ তাঁর অজান্তে ও সম্মতি ছাড়া করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন। এ ঘটনায় সংগীতের মূল বার্তা বিকৃত করার অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক সংগীত অঙ্গনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শিল্পকর্মের অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ থেকে জানা যায়, হোয়াইট হাউসের আনুষ্ঠানিক টিকটক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত ওই সংবেদনশীল ভিডিওটিতে সামরিক হামলার দৃশ্য তুলে ধরা হয়। চিত্রালির পটভূমিতে বাজছিল ক্যাটি পেরির বিশ্বখ্যাত অ্যালবাম ‘টিনএজ ড্রিম’-এর শীর্ষস্থানীয় গান ‘ফায়ারওয়ার্ক’। ভিডিওটির ক্যাপশনে বলা হয়েছিল, ‘ইরানকে সতর্ক করা হয়েছে’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পোস্টটি প্রকাশিত হওয়ার পর তা নজর কাড়ে পপ গায়িকা ক্যাটি পেরির। নিজের গানকে সামরিক বা রাজনৈতিক বার্তার অংশ করার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি এই শিল্পী।
ঘটনার পর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটি আনুষ্ঠানিক বার্তা প্রকাশ করে অসন্তোষ উগড়ে দেন পেরি। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর অজান্তে এবং কোনো ধরনের পূর্বানুমতি ছাড়া এই কাজটি করা হয়েছে। আত্মমর্যাদা, ইতিবাচক শক্তি ও মানুষকে অনুপ্রাণিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি একটি সৃষ্টিকর্মকে সহিংসতা এবং ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে পটভূমি সংগীত হিসেবে ব্যবহার করায় তিনি গভীর মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। এই ধরণের প্রচারণায় তাঁর কোনো সম্মতি কিংবা সমর্থন নেই বলেও তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন। শিল্পী আরও উল্লেখ করেন, গানের মূল দর্শন ও চেতনার সঙ্গে যুদ্ধ বা ধ্বংসাত্মক বার্তার বৈপরীত্য অত্যন্ত স্পষ্ট।
মার্কিন সংগীত জগতের অন্যতম প্রভাবশালী গান ‘ফায়ারওয়ার্ক’ বিলবোর্ড হট ১০০ তালিকায় ১ নম্বর স্থান অর্জনকারী পেরির নয়টি জনপ্রিয় একক গানের একটি। বাণিজ্যিক দিক থেকে এটি মার্কিন পপ সংস্কৃতির অন্যতম সফল সৃষ্টিকর্ম হিসেবে স্বীকৃত। তবে গানটির কপিরাইট বা স্বত্ব নিয়ে রয়েছে কিছু ব্যবসায়িক জটিলতা। ২০২৩ সালে মার্কিন ভিত্তিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘কার্লাইল গ্রুপ’-এর অর্থায়নে পরিচালিত ‘লিটমাস মিউজিক’-এর কাছে পেরি তাঁর প্রথম পাঁচটি সফল অ্যালবামের মাস্টার রেকর্ডিং এবং পাবলিশিং স্বত্ব বিক্রি করে দেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিলবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের এই বিশাল চুক্তির আওতায় ‘টিনএজ ড্রিম’ অ্যালবামের স্বত্বও হস্তান্তরিত হয়। ফলে গানটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনগত ও স্বত্বাধিকার বিষয়ক জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সংগীতভিত্তিক শিল্পকর্মের রাজনৈতিক বা সামরিক উদ্দেশ্যে অননুমোদিত ব্যবহার এবারই প্রথম নয়। মার্কিন রাজনীতিতে এ ধরনের বিতর্ক দীর্ঘদিনের। ইতোপূর্বে ব্রুস স্প্রিংস্টিন, নিল ইয়ং, অ্যাডেল এবং রিহানার মতো বিশ্বখ্যাত শিল্পীরা তাঁদের জনপ্রিয় গান রাজনৈতিক প্রচারণায় বা জনসভায় ব্যবহার না করার জন্য রিপাবলিকান নেতাকুশলীদের সতর্ক করেছিলেন। এমনকি অলিভিয়া রদ্রিগো, সাবরিনা কার্পেন্টারের মতো তরুণ পপ তারকা এবং প্রখ্যাত শিশুতোষ বই সিরিজ ‘ফ্র্যাঙ্কলিন দ্য টার্টল’-এর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘কিডস ক্যান প্রেস’ সরকারি বা রাজনৈতিক সংস্থাসমূহের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলে বিনা অনুমতিতে স্বত্বাধিকারসংক্রান্ত কনটেন্ট ব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।
রাজনীতিতে সক্রিয় হিসেবে পরিচিত ক্যাটি পেরি বরাবরই ডেমোক্রেটিক পার্টির মতাদর্শ সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে কমলা হ্যারিস, জো বাইডেন এবং ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনী প্রচারণায় দৃশ্যমান সমর্থন দিয়েছিলেন। শিল্পীর এ অবস্থান থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের সামরিক প্রচারণামূলক প্রচারকার্যে তাঁর বিশ্বখ্যাত গান ব্যবহারের এ ঘটনা সৃষ্টিশীল কাজের স্বত্বাধিকার রক্ষা এবং সরকারি প্রচারণায় শিল্পের নীতিগত ব্যবহার সংক্রান্ত বিতর্ককে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে।