সংসদ প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে এই বোর্ডে প্রায় ৬৭ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর অবসরের আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ঘাটতি অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
আজ সকালে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানানো হয়। অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম সভাপতিত্ব করেন। এ সময় গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল ওয়ারেছ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বকেয়া ভাতা প্রাপ্তির জটিলতা এবং তাদের জীবনযাত্রার সংকট নিয়ে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি জানতে চান, শিক্ষকেরা অবসর গ্রহণের ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে অবসরকালীন ভাতাদি পাওয়ার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি না।
সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ সুবিধা দ্রুত প্রদানের বিষয়ে সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কাজ করছে। তবে তহবিলের বিশাল ঘাটতির কারণে এই প্রক্রিয়াটি ধীরগতির হয়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক বা কর্মচারী গড়ে প্রায় ১৩ লাখ টাকা অবসর ভাতা পেয়ে থাকেন। সেই হিসেবে বোর্ডে জমা থাকা প্রায় ৬৭ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির জন্য সর্বমোট ৮ হাজার ৭১০ কোটি টাকার প্রয়োজন। কিন্তু এর বিপরীতে বর্তমানে অবসর তহবিলে জমা রয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ফলে এই মুহূর্তে তহবিলে প্রায় ৭ হাজার ৪১০ কোটি টাকার বিশাল অর্থ ঘাটতি বিদ্যমান রয়েছে।
তহবিলের এই সংকট কেবল অবসর সুবিধা বোর্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টেও একই ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ২১ জুন পর্যন্ত কল্যাণ ট্রাস্টে প্রায় ৪৫ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তি করতে এককালীন প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।
এই আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া নানামুখী পদক্ষেপের কথা সংসদে জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। একই সাথে আবেদন নিষ্পত্তির গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার পুনরায় চালুকরণ, দাপ্তরিক জনবল বৃদ্ধি এবং অনলাইন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এছাড়া কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই যেন শিক্ষকেরা সরাসরি টাকা পেতে পারেন, সেজন্য iBAS++ (ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম) পদ্ধতির মাধ্যমে সরাসরি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সংসদে আশাবাদ ব্যক্ত করে জানানো হয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে অবসর সুবিধা বোর্ডের বর্তমান অনিষ্পন্ন আবেদনসমূহ আগামী ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো একটি টেকসই প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে যেকোনো শিক্ষক বা কর্মচারী অবসর গ্রহণের পর সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যেই তাদের সমস্ত প্রাপ্য অবসর ও কল্যাণ সুবিধা কোনো প্রকার ভোগান্তি ছাড়াই বুঝে পেতে পারেন। এর জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রশাসনিক সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।