আইন আদালত ডেস্ক
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার দুটি হত্যা মামলাসহ মোট তিন মামলায় সাবেক রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত। জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার (২১ মে) আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের চেম্বার জজ আদালত ‘নো অর্ডার’ বা কোনো আদেশ নয় মর্মে সিদ্ধান্ত দেন। এর ফলে হাইকোর্ট থেকে প্রাপ্ত অন্তর্বর্তীকালীন জামিন আদেশটি বহাল রইল এবং তাঁর কারামুক্তির আইনগত প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ৫ মে হাইকোর্টের বিচারপতি জাহিদ সারোয়ার কাজল ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ সাবেক এই মন্ত্রীর জামিন মঞ্জুর করে আদেশ দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ ওই জামিন আদেশ স্থগিত করার জন্য আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতে আপিল আবেদন (লিভ টু আপিল) দায়ের করে। বৃহস্পতিবার চেম্বার জজ আদালতে উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে সাড়া না দিয়ে ‘নো অর্ডার’ প্রদান করেন। আদালতে সুজনের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান, মো. মোতাহার হোসেন সাজু, এস এম আবুল হোসেন ও আজহার উল্লাহ ভূইয়া। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে জামিনের বিরোধিতা করে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দা শাজিয়া শারমিন।
মামলার বিবরণ ও পটভূমি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিগত ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল থেকে সাবেক রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনকে গ্রেফতার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর পর থেকে তিনি বিভিন্ন মামলায় দফায় দফায় রিমান্ড ও কারাবাস ভোগ করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম পঞ্চগড় সদর থানার একটি এবং রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার দুটি সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।
প্রথম মামলাটি দায়ের হয় পঞ্চগড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া নিখোঁজ আল আমিনকে হত্যা এবং লাশ গুমের অভিযোগে তাঁর পিতা মো. মনু বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর পঞ্চগড় সদর থানায় এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় নূরুল ইসলাম সুজনসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের আসামি করা হয়। দ্বিতীয় মামলাটি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ী এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হলে ২৮ আগস্ট তাঁর স্ত্রী বাদী হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তৃতীয় মামলাটিও একই থানার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে নিহত হন শিক্ষার্থী ইমরান। ওই ঘটনায় তাঁর মাতা কোহিনূর আক্তার বাদী হয়ে ১ সেপ্টেম্বর ২৯৭ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, যেখানে সাবেক এই মন্ত্রীকে ঘটনার উস্কানিদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আইনজীবীরা জানান, উচ্চ আদালত আসামির বয়স, শারীরিক অসুস্থতা এবং মামলার এজাহারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের গভীরতা বিবেচনা করে জামিন মঞ্জুর করেছিলেন, যা সর্বোচ্চ আদালতের চেম্বার জজ আদালতেও অপরিবর্তিত থাকল।
নূরুল ইসলাম সুজন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং বিশেষ করে পঞ্চগড় জেলা রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। তিনি ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি ধারাবাহিকভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে তিনি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ওই পদে বহাল ছিলেন। বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের অন্য মন্ত্রী-এমপিদের মতো তাঁর বিরুদ্ধেও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চেম্বার আদালতের এই আদেশের ফলে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অন্য মামলাগুলোতে জামিন পাওয়া সাপেক্ষে কারামুক্তির পথ সুগম হতে পারে।