আইন আদালত ডেস্ক
আপিল বিভাগে মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করায় গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। বুধবার (২০ মে) সকালে বিচারপতি আহমেদ সোহেলের একক হাইকোর্ট বেঞ্চে সরকারের জারিকৃত বিলুপ্তির প্রজ্ঞাপনটি উপস্থাপন করা হলে আদালত ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের কাছে এর আইনি ভিত্তি সম্পর্কে জানতে চান। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে আদালত অবমাননা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। একই সাথে ওই সচিবালয়ে কর্মরত ১৫ জন বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। বুধবার সকালে এই প্রজ্ঞাপনটি আদালতের নজরে আনা হলে বিচারপতি আহমেদ সোহেল রাষ্ট্রপক্ষের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন, আপিল বিভাগে বিষয়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় কীভাবে এই ধরনের প্রজ্ঞাপন জারি করা সম্ভব।
এই বিষয়ে রিটকারী পক্ষের আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের জানান, বিচার বিভাগ পৃথককরণের অংশ হিসেবে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন করা হয়েছিল। এই সংক্রান্ত মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পূর্বেই সরকারের এই ধরনের বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ এবং স্পষ্ট আদালত অবমাননা। তিনি আরও জানান, আদালতের নির্দেশনা ও আইনি প্রক্রিয়াকে তোয়াক্কা না করে আকস্মিকভাবে এই প্রজ্ঞাপন জারির বিরুদ্ধে আগামী বৃহস্পতিবার (২১ মে) হাইকোর্টে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক আদালত অবমাননার আবেদন দায়ের করা হবে।
আইনি প্রেক্ষাপট বিবেচনায় জানা যায়, দেশের বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বাধীন করার দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল। এই অধ্যাদেশের আওতায় সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা ও স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে উক্ত অধ্যাদেশটি বাতিল ঘোষণা করে।
সরকারের এই বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হলে, আদালত দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচার বিভাগ পৃথককরণ ও এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধরে রাখার স্বার্থে তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় পুনর্প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। একই সাথে হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে রাষ্ট্রপক্ষের প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন যে, আপিল বিভাগে এই সংক্রান্ত আইনি বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত যেন সচিবালয়ের কার্যক্রমে কোনো রূপ হস্তক্ষেপ বা তা বন্ধ করা না হয়।
আদালতের সেই পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপক্ষ সুপ্রিম কোর্টে কোনো আপিল দায়ের না করেই আকস্মিকভাবে সচিবালয় বিলুপ্তির এই প্রশাসনিক আদেশ জারি করে। আইনজ্ঞদের মতে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও বিচারাধীন মামলার প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় সরকারের এই ধরনের একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত দেশের বিচারিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসনের পরিপন্থী। এর ফলে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতকরণের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।