রাজনীতি ডেস্ক
দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে, অথচ সরকার বাস্তবতাকে আড়াল করে তা স্বীকার করছে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার (১৯ মে) শরীয়তপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত চিকিৎসক ডা. নাসির ইসলামকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে দেখতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি অবিলম্বে উক্ত ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
জানা যায়, সম্প্রতি শরীয়তপুর উপজেলা হাসপাতালে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ডা. নাসির ইসলামের ওপর একদল দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা চালায়। এতে তিনি শারীরিকভাবে মারাত্মক জখম হন। উন্নত চিকিৎসার জন্য পরবর্তীতে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। মঙ্গলবার দুপুরে ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই চিকিৎসককে দেখতে যান জামায়াতে ইসলামীর আমির। তিনি আহত চিকিৎসকের শয্যা পাশে বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করেন, তার চিকিৎসার সর্বশেষ অবস্থার খোঁজখবর নেন এবং দায়িত্বরত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় দলের অন্যান্য শীর্ষ নেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডা. শফিকুর রহমান দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সারা দেশে বর্তমানে এক অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং জনজীবনে নিরাপত্তার অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলেও, সেখানে দৃশ্যমান ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সরকার এই বাস্তব পরিস্থিতি স্বীকার করতে নারাজ। সরকারের পক্ষ থেকে যদি সমস্যার অস্তিত্বই স্বীকার না করা হয়, তবে তার কার্যকর সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, হাসপাতালগুলোতে যদি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে তাদের পক্ষে রোগীদের সুষ্ঠুভাবে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। একজন চিকিৎসক যখন কর্মক্ষেত্রে নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কায় থাকেন, তখন তার পক্ষে স্বাভাবিক সেবা প্রদান ব্যাহত হয়। শরীয়তপুর হাসপাতালের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি সারা দেশে চিকিৎসকদের অনিরাপদ কর্মপরিবেশেরই একটি খণ্ডচিত্র। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসকদের ওপর হামলার বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবি জানিয়ে আসছে। ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে চিকিৎসকদের সেই দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিধ্বনি লক্ষ করা যায়।
এ সময় দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বর্তমান দুরবস্থার জন্য অতীত সরকারের নীতিগত ব্যর্থতাকে সরাসরি দায়ী করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকারের অদূরদর্শী চিন্তাভাবনা, অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড এবং ভুল সিদ্ধান্তের কারণে দেশের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত—স্বাস্থ্য ও শিক্ষা—ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও কাঠামোগত সংস্কারের অভাবে এই খাতগুলো আজ নানা সংকটে জর্জরিত। মেধার যথাযথ মূল্যায়ন না করে অন্যান্য বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই খাতগুলোকে ঢেলে সাজানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি, দুর্নীতিমুক্ত ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
শরীয়তপুরের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জোর দাবি জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ এই নেতা বলেন, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধীরা যাতে কোনোভাবেই প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে না যায়, সেদিকে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। এ ধরনের ঘটনার বিচারহীনতা সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি করে।
পাশাপাশি, দেশের রাজনীতিতে বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের গঠনমূলক অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশ ও জাতির স্বার্থে ন্যায়সংগত এবং ইতিবাচক যেকোনো কাজে বিরোধী দল সর্বদা সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকার যদি কোনো অন্যায় পদক্ষেপ গ্রহণ করে বা জনস্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করে, তবে রাজপথে তার তীব্র ও নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ করা হবে।
সার্বিকভাবে, শরীয়তপুরের এই ঘটনাটি দেশের স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকটিই নতুন করে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের মতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু চিকিৎসকদেরই নিরুৎসাহিত করে না, বরং সাধারণ রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারকেও ক্ষুণ্ন করে। সরকারের উচিত অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ হাসপাতাল চত্বরে এ ধরনের সহিংসতা চালানোর সাহস না পায়। একইসঙ্গে, রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনমূলক সমালোচনা ও যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনায় নিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর উন্নয়নে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।