আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে প্রথাগত প্রচারণাকে ছাপিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই ডিজিটাল বিপ্লবের কেন্দ্রে রয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া থালাপতি বিজয় এবং তার নবগঠিত দল ‘তামিলগা ভেট্টি কাড়াগাম’ (টিভিকে)। বড় কোনো রাজনৈতিক ইতিহাস বা প্রথাগত সাংগঠনিক ভিত্তি ছাড়াই বিজয়ের এই অভাবনীয় সাফল্য ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচনের শুরু থেকেই মাদুরাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে বিজয়ের দলের প্রার্থী মাধার বদরুদ্দিনের অবস্থান ছিল তুলনামূলক দুর্বল। ডিএমকের পালানিভেল থিয়াগা রাজন এবং এআইএডিএমকের সুন্দর সি-র মতো প্রভাবশালী ও অভিজ্ঞ প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপরীতে বদরুদ্দিনের জয়ের সম্ভাবনা শুরুতে ক্ষীণ বলেই মনে করা হয়েছিল। যেখানে বিরোধী পক্ষগুলো বিশাল জনসভা এবং তারকা প্রচারণার মাধ্যমে রাজপথ দখলে রেখেছিল, সেখানে বদরুদ্দিন এবং তার দলের কর্মীরা মনোযোগ দিয়েছিলেন ভিন্ন এক কৌশলে। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে বদরুদ্দিন সবাইকে চমকে দিয়েছেন। তার এই জয়ের পেছনে দলীয় প্রতীক এবং নেতা বিজয়ের ক্যারিশমার পাশাপাশি ডিজিটাল প্রচারণার সমন্বয় প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
টিভিকে-র এই সাফল্য কেবল একটি নির্দিষ্ট আসনে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২৩৪ আসনের তামিলনাড়ু বিধানসভায় বিজয়ের দল ১০৮টি আসনে জয়লাভ করে, যার অধিকাংশ প্রার্থীই ছিলেন রাজনীতিতে নবাগত। সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে মাত্র ১০টি আসন দূরে থাকা এই দলটি পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করে এবং থালাপতি বিজয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রথম নির্বাচনেই এমন ফলাফল তামিলনাড়ুর দীর্ঘদিনের দ্বিমুখী রাজনৈতিক বলয়কে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের এই জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গড়ে ওঠা প্রায় ৮৫ হাজার ফ্যানক্লাবের সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। দল গঠনের পর এই বিশাল ভক্তগোষ্ঠী রাতারাতি একটি অত্যন্ত দক্ষ ‘অনলাইন বাহিনীতে’ রূপান্তরিত হয়। বেঙ্গালুরুভিত্তিক গণমাধ্যম কৌশলবিদদের মতে, এটি ভারতের ইতিহাসের প্রথম নির্বাচন যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জনমত গঠনে এককভাবে নির্ধারকের ভূমিকা পালন করেছে। ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিজয়ের প্রতিটি বক্তৃতা এবং জনসভার অংশবিশেষ ছোট ছোট ভিডিও বা ‘রিলস’ আকারে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। মাদুরাইয়ের একটি সমাবেশ থেকে ধারণ করা বিজয়ের একটি সম্পাদিত সেলফি ভিডিও মাত্র ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৯০ মিলিয়ন ভিউ পাওয়ার ঘটনাটি ডিজিটাল প্রচারণার তীব্রতা স্পষ্ট করে।
এই ডিজিটাল ঢেউ বিশেষ করে তরুণ ভোটার এবং নারীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। যারা প্রথাগত রাজনীতির বাইরে নতুন কিছু খুঁজছিলেন, তাদের কাছে বিজয়ের উপস্থিতি ছিল আকর্ষণীয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিজয়ের প্রতিটি শারীরিক উপস্থিতি বা জনসভা দ্রুত একটি ‘দ্বিতীয় ডিজিটাল জীবন’ লাভ করত, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ত। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিপক্ষ দলগুলো তাদের বিশাল বাজেট এবং মাঠ পর্যায়ের প্রচার নিয়ে অনেকটা পিছিয়ে পড়ে।
তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিজয়ের এই চমকপ্রদ প্রবেশ এখন নতুন এক পরীক্ষার সম্মুখীন। বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জোয়ারে নির্বাচনে জয় পাওয়া সম্ভব হলেও, দীর্ঘমেয়াদে সরকার পরিচালনা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা প্রদর্শনই হবে তার আসল চ্যালেঞ্জ। মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা মোকাবিলা করে বিজয় তার ডিজিটাল জনপ্রিয়তাকে সুশাসনে রূপান্তর করতে পারেন কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে তামিলগা ভেট্টি কাড়াগামের ভবিষ্যৎ অবস্থান। তামিলনাড়ুর এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক রাজনীতিতে ব্যালট বক্সের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে এখন কি-বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সমভাবে জরুরি।