আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো প্রশাসনিক সচিবালয় নবান্নে উপস্থিত হয়ে দাপ্তরিক কাজ শুরু করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তার গাড়িবহর হাওড়ার নবান্নে পৌঁছালে নতুন সরকারের প্রশাসনিক যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। ঐতিহাসিক এই দিনটি ঘিরে সকাল থেকেই কলকাতার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক কর্মতৎপরতা পরিলক্ষিত হয়েছে।
সচিবালয়ে পৌঁছানোর পর নবান্নের প্রধান ফটকের সামনে রাজ্য পুলিশের পক্ষ থেকে নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত এই আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে স্বাগত জানান রাজ্যের শীর্ষ আমলারা। মুখ্য সচিব দুষ্মন্ত নারিয়ালা, স্বরাষ্ট্র সচিব সংঘমিত্রা ঘোষ, রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক সিদ্ধিনাথ গুপ্তা এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ পুষ্পস্তবক দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে বরণ করে নেন। এর পরপরই তিনি তার নির্ধারিত কক্ষে প্রবেশ করেন এবং দাপ্তরিক কাজে মনোনিবেশ করেন।
নবান্নে আসার আগে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন। সকালে কলকাতার চিনার পার্কের বাসভবন থেকে তিনি সল্টলেকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বাসভবনে যান। সেখানে দুই নেতার মধ্যে প্রায় ২৫ মিনিট রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর শমীক ভট্টাচার্যকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সল্টলেকে দলীয় কার্যালয়ে পৌঁছান। সেখানে তাকে উত্তরীয় পরিয়ে এবং শঙ্খ বাজিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। দলীয় কার্যালয়ে জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি। এ সময় দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে ২০৭টি পদ্মফুলের তৈরি একটি বিশাল মালা দিয়ে সংবর্ধনা জানান। সেখানে উপস্থিত নেতাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সাংগঠনিক আলোচনার পর তিনি সরাসরি নবান্নের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি এদিন সকালে নবান্নে উপস্থিত হন নবনিযুক্ত পাঁচ জন ক্যাবিনেট মন্ত্রী। প্রথম কার্যদিবসেই মুখ্যমন্ত্রী পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করার সূচি নির্ধারণ করেছেন। দিনের প্রথম বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় পাঁচ ক্যাবিনেট মন্ত্রী—দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, নিশীথ প্রামাণিক, অশোক কীর্তনীয়া ও ক্ষুদিরাম টুডুর সঙ্গে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই বৈঠকে রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ উন্নয়ন ও অবকাঠামো সংক্রান্ত প্রকল্পগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
প্রশাসনিক এই কর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে বিকেল ৫টায় একটি উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা বৈঠক আহ্বান করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। উক্ত বৈঠকে রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজি), এডিজি (আইনশৃঙ্খলা), বিভিন্ন কমিশনারেটের পুলিশ কমিশনার এবং জেলা পুলিশ সুপারদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশি কাঠামোর সংস্কারে নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কী হতে যাচ্ছে, এই বৈঠক থেকে তার একটি প্রাথমিক রূপরেখা পাওয়া যেতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার এই পালাবদল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ সময় পর নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তি নবান্নের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় প্রশাসনিক স্তরে বড় ধরনের রদবদলের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে উন্নয়ন প্রকল্প ত্বরান্বিত করা এবং রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নই এখন নতুন প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন এই মন্ত্রিসভা শুরু থেকেই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নবান্নের করিডোর থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের নজর এখন বিকেলে অনুষ্ঠিতব্য প্রশাসনিক বৈঠকের নির্দেশনার দিকে।