বিশেষ প্রতিবেদক
বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি সুরক্ষিত রাখতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে ভারতীয় নাগরিকদের সাশ্রয়ী ও মিতব্যয়ী জীবনযাপনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। রোববার এক জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর বক্তব্যে জ্বালানি ব্যয় হ্রাসে করোনা মহামারিকালীন অভ্যাসগুলোকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, মহামারির সময় প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানুষ যেভাবে ঘরে বসে কাজ (ওয়ার্ক ফ্রম হোম), অনলাইন মিটিং এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সেই অভ্যাসগুলো আবার চর্চা করা প্রয়োজন। এর ফলে যাতায়াত বাবদ জ্বালানি তেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ঘটনা এবং পরবর্তীতে তেহরানের পাল্টা পদক্ষেপের ফলে ওই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ খনিজ তেল পরিবহন করা হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি সংঘাতের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় বিশ্ববাজারে পেট্রোল ও ডিজেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর।
এই প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদি ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় নাগরিকদের দায়িত্বশীল হওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, পেট্রোল ও ডিজেল আমদানিতে ভারতকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ব্যয় সংকোচন করা অত্যন্ত জরুরি। জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি তিনি বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে আগামী অন্তত এক বছর স্বর্ণ কেনা থেকে বিরত থাকার জন্য দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। মূলত আমদানিনির্ভর বিলাসবহুল পণ্যের চাহিদা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুসংহত রাখাই এই আহ্বানের মূল লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের ওপর জোর দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভোজ্যতেলের ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে কৃষকদের রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রাকৃতিক ও জৈব চাষাবাদের দিকে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, রাসায়নিক সার আমদানিতেও সরকারকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা প্রাকৃতিক চাষাবাদের মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব। এটি একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে, অন্যদিকে মাটির স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদী উর্বরতা রক্ষা করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা ভারতের অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে এমন আশঙ্কায় সরকার আগেভাগেই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান মূলত দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ নাগরিকদের ছোট ছোট পরিবর্তন ও সাশ্রয়ী মনোভাব ভারতের জাতীয় অর্থনীতিকে বড় ধরনের সংকট থেকে রক্ষা করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে মনে করা হচ্ছে।