আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। ইরানকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান এবং সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কায় সোমবার (১১ মে) আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার পথ সংকুচিত হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পণ্য বাজারে।
বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সোমবার লেনদেনের শুরুতে জুন মাসে সরবরাহের চুক্তিতে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিন প্রতি ব্যারেল মার্কিন অপরিশোধিত তেল ৯৫ ডলার ৪২ সেন্টে কেনাবেচা হয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলার ৪৯ সেন্টে গিয়ে ঠেকেছে। গত কয়েক মাসের মধ্যে জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধিকে অন্যতম সর্বোচ্চ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূলত সরবরাহকারী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও যুদ্ধের দামামা এই অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে।
জ্বালানি বাজারের এই অস্থিতিশীলতার মূলে রয়েছে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সংঘাত। সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এক প্রকাশ্য বার্তায় ইরানকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে চলমান বিরোধ এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখনো বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পারমাণবিক উপকরণগুলো পুরোপুরি সরিয়ে নিতে হবে এবং তাদের সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করতে হবে। ইসরায়েলের এই কঠোর অবস্থান সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া সাম্প্রতিক একটি পাল্টা প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প ওই প্রস্তাবটিকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেন। মার্কিন প্রশাসনের এমন অনমনীয় মনোভাবের ফলে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ আরও রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। পাকিস্তান হয়ে ইরানের দেওয়া জবাবটি ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত তা কোনো ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে পারেনি। ফলে তেল উৎপাদনকারী দেশ ইরান এবং আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা ব্যর্থ হলে তেলের বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে সংকটের শঙ্কা দেখা দিচ্ছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যদি ইরান এই প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ কঠোর করে বা কোনো কারণে সরবরাহ পথটি রুদ্ধ হয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
বিশ্ববাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ সংকটের এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ যদি অব্যাহত থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে কেবল পরিবহন বা উৎপাদন ব্যয় নয়, বরং বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জ্বালানি আমদানির বাড়তি খরচ সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সার্বিক পরিস্থিতি এখন নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং বিশ্বশক্তির প্রভাব বিস্তারের ওপর।