নিজস্ব প্রতিবেদক
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় উন্নত নির্মাণসামগ্রী, পরিবেশবান্ধব প্রকৌশল এবং জলবায়ু সহনশীল নকশার সমন্বয়ে টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি উল্লেখ করেছেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ক্ষয়রোধী উপকূলীয় অবকাঠামো নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।
সোমবার রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আইইবি’র ৭৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ‘বাংলাদেশে ক্ষয়রোধী উপকূলীয় অবকাঠামো এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল উদ্বোধন ও সনদ প্রদান’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
সেমিনারে মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় এলাকায় ভূমি ক্ষয়ের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর ফলে কৃষি জমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। পাশাপাশি সামুদ্রিক দূষণ ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত প্রকৌশল বিদ্যা ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে পানিসম্পদ মন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল, পুকুর ও জলাধার খনন এবং পুনঃখননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে, যা বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে একটি শক্তিশালী ‘সবুজ বেষ্টনী’ তৈরি করবে। এই বনায়ন উপকূলীয় মাটির ক্ষয় রোধ এবং জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা হ্রাসে প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে কাজ করবে।
বক্তব্যে তিনি উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ‘কোস্টাল জোন ম্যানেজমেন্ট রুলস’ এবং ‘স্পেশাল ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান’ প্রণয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, উপকূলীয় কৃষিজমি সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে দূষণমুক্ত উপকূল গড়ার আহ্বান জানান তিনি। মন্ত্রী মনে করেন, উপকূলীয় মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে উপকূলীয় বাঁধ ভেঙে জানমালের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। মন্ত্রীর প্রস্তাবিত জলবায়ু সহনশীল নকশা ও ক্ষয়রোধী অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে এই ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে এবং ব্লু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির প্রসারে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
আইইবি’র সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন আইইবি ও রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম, আইইবি’র সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশনের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম খোকন এবং এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মো. বেলাল হোসেন। সেমিনার শেষে প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালের উদ্বোধন ও প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে সনদ প্রদান করা হয়। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই নতুন প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল উপকূলীয় প্রকৌশল বিদ্যায় নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।