নিজস্ব প্রতিবেদক
আইনজীবীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে পর্যায়ক্রমে ৮০ হাজার আইনজীবীকে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে একটি বন্ধুপ্রতিম দেশের সাথে আলোচনা শুরু হয়েছে। রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের ‘ইয়াং ব্যারিস্টার্স’ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এমপি এই তথ্য জানান। ‘ট্রান্সফরমেশন অব লিগ্যাল প্র্যাকটিস থ্রু ইমার্জিং টেকনোলজিস অ্যান্ড এআই’ শীর্ষক এই সেমিনারে দেশের আইনি পেশায় প্রযুক্তির সমন্বয় ও সমসাময়িক চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যে দেশের বর্তমান আইনি শিক্ষা ও বার কাউন্সিল এনরোলমেন্ট বা আইনজীবী তালিকাভুক্তি পরীক্ষার বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে আসা বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেখা করা মেধাবী তরুণদের জন্য বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি বেশ জটিল। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় প্রশ্ন প্রণয়ন ও উত্তর প্রদানের বাধ্যবাধকতা অনেক সময় মেধাবী শিক্ষার্থীদের পেশায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। এই পদ্ধতি সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আইনি পেশাকে সমৃদ্ধ করতে হলে মেধাবী তরুণদের সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের বিচারিক অঙ্গনে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে। এনরোলমেন্ট প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে অনেক দক্ষ ও মেধাবী আইনজীবী মূল পেশা ছেড়ে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্পোরেট চাকরিতে যুক্ত হচ্ছেন, যা আইনি পেশার জন্য এক ধরণের মেধা পাচার।
বিচার বিভাগের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সেবার মান বৃদ্ধির জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়েও মন্ত্রী জোরালো দাবি জানান। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে আদালতসমূহে বিভিন্ন কোর্ট ফি ও স্ট্যাম্প বিক্রির মাধ্যমে প্রতি বছর সরকার ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আয় করে থাকে। অথচ এর বিপরীতে গোটা বিচার বিভাগের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয় মাত্র ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের তুলনায় এই বরাদ্দের হার অত্যন্ত অপ্রতুল। বিচার বিভাগের সামগ্রিক আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিবান্ধব আদালত গঠন এবং বিচারকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে এই বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আইনি সেবার গুণগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, বিশ্বব্যাপী আইনি পেশায় আমূল পরিবর্তন আসছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে মামলার গবেষণা ও নথিপত্র ব্যবস্থাপনায় গতিশীলতা আসবে। বাংলাদেশের তরুণ আইনজীবীদের এই প্রযুক্তির সাথে পরিচিত করতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। মন্ত্রী আশ্বাস দেন যে, সরকার বিচার বিভাগকে ডিজিটালাইজড করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে, যার সুফল আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী উভয় পক্ষই পাবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি আইনজীবীদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় এবং দক্ষতা উন্নয়নে বার কাউন্সিলের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। এছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন এমপি, ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এমপি এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন। অনুষ্ঠানে বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, দক্ষ আইনজীবী গড়ে তুলতে পারলে মামলা জট নিরসনে তা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। দেশের আইনি কাঠামোর সংস্কার এবং প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বিচার বিভাগ আরও জনবান্ধব ও স্বচ্ছ হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তরুণ ব্যারিস্টার ও কর্পোরেট আইনজীবীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি আইন পেশার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।