আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারত সফলভাবে পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম একটি অত্যাধুনিক আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের (আইসিবিএম) পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করেছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ওডিশা উপকূলীয় অঞ্চলে দেশটির প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) এবং বিমানবাহিনীর যৌথ তত্ত্বাবধানে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ‘ট্যাকটিক্যাল অ্যাডভান্সড রেঞ্জ অগমেন্টেশন’ প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্ত এই ফ্লাইট ট্রায়ালটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা ভারতের দূরপাল্লার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, পরীক্ষিত এই প্রযুক্তিটি মূলত ভারতের নিজস্ব উদ্ভাবন। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি সাধারণ বোমা বা প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্রকেও অত্যন্ত নির্ভুল লক্ষ্যভেদী অস্ত্রে রূপান্তর করতে সক্ষম। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ ভারতের কৌশলগত সামরিক শক্তিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। যদিও প্রতিরক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে একে ‘অগ্নি-৬’ নামে অভিহিত করা হয়নি, তবে সমরাস্ত্র বিশেষজ্ঞরা ক্ষেপণাস্ত্রটির গতিপ্রকৃতি ও পাল্লা বিশ্লেষণ করে এটিকে আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র শ্রেণির বলেই উল্লেখ করেছেন।
প্রাথমিক তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের বরাতে জানা গেছে, এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১০ হাজার কিলোমিটারের অধিক হতে পারে। ভারতের বর্তমান সমরাস্ত্র ভাণ্ডারে থাকা অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। নতুন এই ক্ষেপণাস্ত্রের সফল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হলে ভারতের প্রতিরক্ষা বলয় দক্ষিণ এশিয়া ছাড়িয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে বিস্তৃত হবে। বিশেষ করে ১০ হাজার কিলোমিটারের অধিক পাল্লার সক্ষমতা অর্জন করার অর্থ হলো বিশ্বের প্রায় যে কোনো প্রান্ত ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির আওতায় চলে আসা।
কৌশলগত প্রেক্ষাপটে বর্তমান বিশ্বে ১২ হাজার কিলোমিটারের বেশি পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি রাষ্ট্রের কাছে। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়া। ভারতের এই সাম্প্রতিক পরীক্ষা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দেশটিকে বিশ্বশক্তির এই ক্ষুদ্র ও প্রভাবশালী বলয়ে স্থান করে নেওয়ার পথে অনেকটাই এগিয়ে দিল। দীর্ঘ দিন ধরেই ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণাগারগুলোতে এই প্রযুক্তির মানোন্নয়নে কাজ চলছিল।
এর আগে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক প্রতিরক্ষা সম্মেলনে ডিআরডিও-র চেয়ারম্যান সমীর ভি কামাত জানিয়েছিলেন, অগ্নি-৬ কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি তারা সম্পন্ন করে রেখেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়া মাত্রই পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করতে সংস্থাটি প্রস্তুত। শুক্রবারের এই পরীক্ষা সেই প্রস্তুতিরই একটি অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। সরকারের শীর্ষ মহলের পক্ষ থেকেও এই কর্মসূচির প্রতি পূর্ণ সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বিজেপির পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত এক ভিডিওচিত্রেও এই ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সেখানে জানানো হয়, এটি বহুমুখী ওয়ারহেড বা ‘মাল্টিপল ইন্ডিপেন্ডেন্টলি টার্গেটেবল রি-এন্ট্রি ভেহিকল’ (এমআইআরভি) বহন করতে সক্ষম। এর অর্থ হলো একটি মাত্র ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানা সম্ভব হবে। এটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশটির সামরিক মর্যাদা এবং দরকষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে ভারতের এই পরীক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ভারত দীর্ঘ দিন ধরে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির আধুনিকায়ন করে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইসিবিএম প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ কেবল ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং এটি আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের সামরিক শক্তি প্রদর্শন হিসেবেও গণ্য হবে। তবে এই পরীক্ষার ফলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে বিদ্যমান নিরাপত্তা সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে বিশ্লেষণ চলছে। বর্তমানে ক্ষেপণাস্ত্রটির বিভিন্ন কারিগরি তথ্য আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং পরবর্তী ধাপের পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।