আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ সংলগ্ন পারস্য উপসাগরের বিশাল জলরাশিতে বড় ধরনের তেল নিঃসরণের আলামত পাওয়া গেছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে পরিবেশ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সমুদ্রের প্রায় ৪৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় এই তেল ছড়িয়ে পড়েছে, যা ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক পরিবেশ ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কপারনিকাস সেন্টিনেল-১, সেন্টিনেল-২ এবং সেন্টিনেল-৩ স্যাটেলাইট থেকে গত ৬ মে থেকে ৮ মে’র মধ্যে প্রাপ্ত ছবিগুলো পর্যবেক্ষণ করে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ছবিতে দেখা গেছে, খার্গ দ্বীপের পশ্চিম দিকে সমুদ্রের পানির ওপর একটি ধূসর-সাদা রঙের স্তর তৈরি হয়েছে। পরিবেশবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কনফ্লিক্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অবজারভেটরির গবেষক লিওন মোরল্যান্ড জানান, প্রাপ্ত ছবির স্তরটির গঠন ও প্রকৃতি অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
জলবায়ু ও জ্বালানি বিশ্লেষণ সংস্থা ‘ডাটা ডেস্ক’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা লুই গডার্ড এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় পরিবেশগত বিপর্যয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত শুরুর পর এটিই সম্ভবত সমুদ্রপৃষ্ঠে সবচেয়ে বড় তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা। তবে এই নিঃসরণের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি। সমুদ্রের তলদেশের পাইপলাইনে লিকেজ, কোনো ট্যাঙ্কার থেকে নিঃসরণ নাকি সামরিক কোনো তৎপরতার ফলে এই বিপর্যয় ঘটেছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। তবে গবেষকদের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নতুন করে তেল নিঃসরণ আপাতত বন্ধ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে খার্গ দ্বীপ ইরানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই দ্বীপের টার্মিনালগুলোর মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। বিশেষ করে চীনে সরবরাহকৃত ইরানি তেলের প্রধান উৎস এই কেন্দ্রটি। পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যে কোনো ধরনের বিপর্যয় বা সরবরাহ বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব সরাসরি বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যের ওপর পড়ে।
বিগত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই সংঘাতের প্রভাবে ইতোমধ্যেই শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলের ট্যাঙ্কার আটকা পড়েছে অথবা তাদের পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। মার্কিন সামরিক সূত্রগুলো এর আগে দাবি করেছিল যে, তারা এই দ্বীপের কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করেছে, যা ওই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ৪৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এই তেল দ্রুত অপসারণ করা না গেলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। পারস্য উপসাগরের বাস্তুসংস্থান এমনিতেই অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই তেল নিঃসরণ দীর্ঘস্থায়ী হলে স্থানীয় মৎস্য সম্পদ এবং প্রবাল প্রাচীরের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থাগুলো ইরানকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঘটনার স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে পারস্য উপসাগরে নিরাপদ জাহাজ চলাচলের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।