অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সঙ্গে এক ঐতিহাসিক ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদন করেছে মালয়েশিয়াভিত্তিক বিমান পরিষেবা সংস্থা এয়ার এশিয়া। এই চুক্তির আওতায় এয়ার এশিয়াকে তাদের সর্বাধুনিক প্রজন্মের ‘এ২২০-৩০০’ সিরিজের ১৫০টি উড়োজাহাজ সরবরাহ করবে ইউরোপীয় এই বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। গতকাল ৬ মে কানাডার কুইবেক প্রদেশের মিরাবেল শহরে এয়ারবাসের আঞ্চলিক দপ্তরে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। উড়োজাহাজগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এয়ার এশিয়ার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সংস্থার উপদেষ্টা টনি ফার্নান্দেজ এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লার্স ওয়াগনার। আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন এই আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক ক্র্যানি এবং কুইবেকের মুখ্যমন্ত্রী ক্রিস্টিন ফ্রেশেট। ১৯৭০ সালে যাত্রা শুরু করা এয়ারবাসের দীর্ঘ ইতিহাসে এটিই কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পাওয়া বৃহত্তম ক্রয়াদেশ। এভিয়েশন খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চুক্তি বৈশ্বিক বিমান পরিবহন শিল্পে নতুন এক মাইলফলক স্থাপন করল।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে এয়ারবাসের ‘এ২২০-৩০০’ সিরিজের এই উড়োজাহাজগুলো অত্যন্ত আধুনিক ও জ্বালানি সাশ্রয়ী। সাধারণত এই মডেলের উড়োজাহাজগুলোতে ১৬০টি যাত্রী আসন থাকলেও এয়ার এশিয়ার চাহিদা অনুযায়ী বিশেষ নকশায় তৈরি করা বিমানগুলোতে অতিরিক্ত আরও ১০টি আসন যুক্ত করা হবে। ফলে প্রতিটি বিমানে মোট ১৭০ জন যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। এছাড়া নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিমানের উভয় পাশে বাড়তি ‘ওভারউইং এক্সিট’ বা জরুরি বহির্গমন পথ রাখা হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে এই বিমানগুলো কম কার্বন নিঃসরণ নিশ্চিত করবে, যা বর্তমান বিশ্বের পরিবেশবান্ধব বিমান চলাচলের নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরবরাহকৃত ১৫০টি উড়োজাহাজের মধ্যে বিভিন্ন আকারের বিমান থাকবে। অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের বিমানগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার স্বল্প দূরত্বের রুটগুলোতে ব্যবহার করা হবে। অন্যদিকে, বড় আকারের বিমানগুলো দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী পরিবহনে নিয়োজিত করা হবে। এয়ার এশিয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের পরিষেবাকে আরও সাশ্রয়ী এবং বিশ্বমানের পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যেই এই বিশাল বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক রুটে তাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এয়ারবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানিটি এক নতুন বাণিজ্যিক অধ্যায়ে প্রবেশ করল। এত বড় পরিসরের ক্রয়াদেশ বিশ্ববাজারে এয়ারবাসের সক্ষমতা ও জনপ্রিয়তারই প্রতিফলন। অন্যদিকে, বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ১৯০০ কোটি ডলারের এই চুক্তি কেবল দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি এভিয়েশন শিল্পের বর্তমান অস্থিরতা কাটিয়ে ওঠার একটি বড় ইঙ্গিত। করোনাত্তর সময়ে বৈশ্বিক পর্যটন ও বিমান চলাচল খাতে যে মন্দা দেখা দিয়েছিল, এই ধরনের বড় বিনিয়োগ সেই খাতের পুনরুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং বিমান বহর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে এয়ার এশিয়া এই পদক্ষেপ নিয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পর্যায়ক্রমে এই ১৫০টি উড়োজাহাজ এয়ার এশিয়ার বহরে যুক্ত হবে। এই বিশাল প্রকল্পের বাস্তবায়ন মালয়েশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে এবং আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।