নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারের গৃহীত জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিসমূহ বাস্তবায়নে জনসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি। তিনি বলেন, সরকারি সেবার মূল কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে দেশের সাধারণ মানুষ। মানুষের প্রতি প্রশাসনের সেবা হতে হবে নিবেদিতপ্রাণ এবং এটি সর্বাবস্থায় স্মরণে রেখে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
রোববার (৩ মে) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে চার দিনব্যাপী ‘জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জেলা প্রশাসকদের পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার সাথে সরকারের নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জেলা প্রশাসক পদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ১৭৭২ সালে ব্রিটিশ ভারতে প্রথম ‘ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর’ পদটি সৃষ্টি করা হয়। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় এই কার্যালয় আজও কালেক্টরেট হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলার প্রয়োজনে ফৌজদারি বিচার ক্ষমতা অর্পণের মাধ্যমে ‘ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট’ এবং পাকিস্তান আমলে উন্নয়ন কার্যক্রমের সমন্বয়ের জন্য ‘ডেপুটি কমিশনার’ বা জেলা প্রশাসক সত্তাটি তৈরি হয়। বর্তমানে এই পদের কার্যপরিধি বহুমাত্রিকভাবে বিস্তৃত হয়েছে এবং জেলা প্রশাসকগণ মাঠ পর্যায়ে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছেন।
ড. নাসিমুল গনি উল্লেখ করেন, জেলা প্রশাসক সম্মেলন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সাথে মাঠ প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সংলাপের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে প্রশাসনের কর্মকর্তারা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সরাসরি দিকনির্দেশনা ও কর্মস্পৃহা লাভ করেন। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকরাই মাঠ প্রশাসনের মূল চালিকাশক্তি। সরকারের প্রতিটি অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি সফলভাবে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া তাদের নৈতিক ও দাপ্তরিক দায়িত্ব।
বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার পরিবারকে উন্নয়নের মূল একক হিসেবে বিবেচনা করে নারীর মর্যাদা নিশ্চিতকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নয়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় সঠিক ও প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচনে জেলা প্রশাসকদের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কঠোর নির্দেশনা দেন তিনি। এছাড়া ধর্মীয় সেবায় নিয়োজিত ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত ও ভিক্ষুদের জন্য সরকারের চালু করা নতুন পাইলট প্রকল্পের বিষয়েও তিনি আলোকপাত করেন এবং এর সফল বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের তৎপর থাকার আহ্বান জানান।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহার এখন কেবল কৃচ্ছ্রসাধন নয়, বরং জাতীয় দায়িত্ব। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বারোপ করেছে। সরকারি ও বেসরকারি সকল দপ্তরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়িতা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকদের তদারকি বাড়ানোর নির্দেশ দেন তিনি। তিনি বলেন, সম্পদের অপচয় রোধ করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে মাঠ প্রশাসনের সময়োপযোগী ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।
চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনে জেলা প্রশাসকরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মন্ত্রী এবং সচিবদের সাথে সরাসরি মতবিনিময় করবেন। সম্মেলনে ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় সরকার কাঠামোর শক্তিশালীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। মাঠ পর্যায়ের সমস্যাগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরে টেকসই সমাধান খুঁজে বের করাই এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য।